বাংলাদেশে বাস-পিকআপের সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত


#হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যু থামছেই না। যত দিন যাচ্ছে, বড় হচ্ছে ‘মৃত্যুর মিছিল’। কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব, অদক্ষ চালক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতা, মাদক আর অব্যবস্থাপনায় সড়কে চলছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়কে ঝরছে প্রাণ। দিনের পর দিন যেন সড়কে বেড়েই চলছে প্রাণহানি। এতকিছুর পরও যেন কেউ দেখেও দেখছে না। প্রতিবছর দেশে গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার বা এর চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় সড়কে। আহত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ফরিদপুরের কানাইপুর ইউনিয়নের দিগনগর তেঁতুলতলা এলাকায় বাস ও পিকআপ মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৪ জনেরই পরিচয় পাওয়া গেছে। কানাইপুরে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি। মঙ্গলবার সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ শহীদ মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে এক বিবৃতিতে এ শোক প্রকাশ করেন।

ফরিদপুরে সড়কদুঘর্টনাটি তদন্ত করে দেখার জন্য ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনায় ময়মনসিংহ ২ জন, চট্টগ্রামে ১ জন ও গোপালগঞ্জে ১ জন মারা গেছেন।
ফরিদপুর কানাইপুরের স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে মাগুরাগামী ইউনিক পরিবহনের সাথে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থেকে আসা একটি পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ১১ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ জন এবং ঢাকা নেওয়ার পথে পদ্মা সেতু এলাকায় ১ জন মারা যান। নিহতরা হলেন, আলফাডাঙ্গা উপজেলার হিদাডাঙ্গা গ্রামের সৈয়দ নেওয়াজ আলীর মেয়ে জাহিনুর বেগম (৬০), আলেক সরদারের স্ত্রী শুকুরুন নেছা (৭০), মৃত ইব্রাহিম খাঁর স্ত্রী সুর্য বেগম (৫০), কুসিমদি গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে পিকআপচালক মো. নজরুল ইসলাম (৩৫), বেজিডাঙ্গা গ্রামের নান্নু মোল্লার স্ত্রী জাহানারা বেগম (৪৫), মিল্টন শেখের স্ত্রী সোনিয়া বেগম (২৮), মেয়ে নুরানি (২), চর বাকাইল গ্রামের মৃত রশিদ খানের ছেলে তবিবুর খান(৫৫), বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নের ছত্রকান্দা গ্রামের তারা মোল্লার ছেলে রাকিব হোসেন মোল্লা মিলন (৪২), তার স্ত্রী শামিমা ইসলাম সুমি (২৫), দুই ছেলে আলভি রুহান মোল্লা (৭), আবু ছিনান ওরফে হাবিব মোল্লা (৪), প্রতিবেশী মৃত আব্দুল ওহাবের স্ত্রী মর্জিনা বেগম (৬৫) ও ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার কুমরাইল গ্রামের বাসিন্দা মো. ইকবাল হোসেন।

স্থানীয় শেখর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইস্রাফিল মোল্লা বলেন, একই পরিবারের চারজন ও প্রতিবেশীসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও পাশের আলফাডাঙ্গা উপজেলার হিদাডাঙ্গা গ্রামের একই পরিবারের দুজনসহ আটজন নিহত হয়েছেন। নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। ফরিদপুর সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী, বোয়ালমারী,আলফাডাঙ্গা সার্কেল) মো. মিজানুর রহমান বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো.কামরুল আহসান তালুকদার বলেন, নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে তাৎক্ষণিক ২০ হাজার এবং আহত পাঁচজনের পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে পাঁচ লাখ ও আহতের তিন লাখ করে টাকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ঘটনাটি তদন্ত করে দেখার জন্য ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ফরিদপুরের কানাইপুরে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি। গতকাল মঙ্গলবার সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ শহীদ মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে এক বিবৃতিতে এ শোক প্রকাশ করেন। সকালে বাস ও পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। বিবৃতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানসহ পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন যাত্রী নিয়ে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থেকে ঢাকায় আসছিল। নিহত সবাই পিকআপ ভ্যানের যাত্রী ছিলেন। সুতরাং পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির দায় এড়াতে পারে না বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা নিহত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ ও চিকিৎসা শেষে পুনর্বাসনের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। এছাড়া বিবৃতিতে নিহতদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা, শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হয়।

অপরদিকে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ময়মনসিংহ-তারাকান্দা সড়কের কোদালধর বাজারের রামচন্দ্রপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তারাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াজেদ আলী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তারাকান্দায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে অন্তত ১০-১২ জনকে আনা হয়েছে। এদের মাঝে ছয়জনকে ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আউটার লিংক রোডের সড়ক সড়ক বিভাজকের সঙ্গে পাজেরো গাড়ির ধাক্কা লেগে এক বিদেশি নারী শিক্ষাথী (২৫) নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুই জন। গত সোমবার রাত একটার দিকে লিংক রোডের চরপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ওই শিক্ষার্থী লাউসের নাগরিক ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। পতেঙ্গা থানার ওসি কবিরুল ইসলাম বলেন, মধ্যরাতে সড়ক বিভাজকের সঙ্গে একটি পাজেরো গাড়ির ধাক্কা লাগে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

আহত দুইজন নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, পাজেরো গাড়িটির সামনের চাকা ব্লাস্ট হওয়ার কারণে সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভাজকে ধাক্কা লাগে বলে ধারণা করছি। নিহত ওই বিদেশি শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য দুই জন বাংলাদেশি। তারা সম্পর্কে ভাই-বোন। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। গোপালগঞ্জে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। নিহত রায়হান মোল্লা (১৮) শহরের বেদগ্রাম এলাকার বিল্লাল মোল্লার ছেলে এবং সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের এইচএসসি ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। গত সোমবার ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে শহরের রেলস্টেশন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আনিচুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ৮টার দিকে গোপালগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে শহরের দিকে আসছিলেন রায়হান। পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ইজিবাইক মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে রায়হান গুরুতর আহত হয়। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment

Choose অবস্থা