News Britant

Wednesday, August 17, 2022

‘ভর’পরার রসায়ন: একটি মনস্তত্ত্ব – নৃতাত্ত্বিক আলোচনা

Listen

#ড. অরূপ মজুমদার, নৃ-তত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানের গবেষকঃ আজ থেকে প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে- আফ্রিকা থেকে নরগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ ধীরে ধীরে অন্যান্য মহাদেশের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। পরবর্তীতে, ঐ নরগোষ্ঠীর একটি দল এশিয়া মহাদেশে ঢুকে পড়ে। আর এর মধ্যের একটি দলকে প্রোটো-অস্ট্রালয়েড নামে বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন। এদের গায়ের রং কালো, নাক অনুচ্চ, চুল কালো ও কুঞ্চিত, উচ্চতা মাঝারি। বর্তমানে এরা কোড়া আদিবাসী হিসেবে পরিচিত।
এই কোড়া আদিবাসী ভাষাটি হল অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবার-এর অন্তরর্গত। যাইহোক, “কোড়া” (কোডা) ভাষাটি মুণ্ডা ভাষাগোষ্ঠীর একটি বিছিন্ন শাখা। সাধারণভাবে এদের ভাষাকে অস্ট্রিক ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অনুমান করা হয়, অস্ট্রিক ভাষাভাষী মানুষদের একটি বড় অংশ ভারতবর্ষের প্রবেশ করেছিল খাইবার-বোলান গিরিপথ দিয়ে, গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডাস-এর বিবরণ থেকে এসকল তথ্য জানা যায়।বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করে বলা যায়, কোড়া আদিবাসীরা ছোটনাগপুরের আদিবাসী, তারা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মুঙ্গের, ভাগলপুর, হাজারীবাগ, ধলভূম, মানভূম প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাস করতে থাকে। এই আদিবাসী কোড়ারা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। যেমন- ধলো, মালো, শিখরিয়া, সোনারেখা, বাদামিয়া, প্রভৃতি।
ঐতিহাসিক H. H. Risle সাহেব, কোড়াদের সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে- যাহারা ধল অঞ্চল থেকে এসেছিলেন তাহার ধলো, যাহারা মানভূম থেকে এসেছিলেন তাহারা মালো, যাহারা শিকার অঞ্চল থেকে এসেছিলেন তাহারা শিখারিয়া, আবার যাহারা সুর্বনরেখা নদীর পাশের অঞ্চল থেকে এসেছিলেন তাহারা সোনারেখা নামে পরিচিত।
যাইহোক, গত ১৭ এবং ১৮ মার্চ, ২০২১- আদিবাসী কোড়া সমাজের ‘বাহা বঙ্গা’ ও ‘বাহা পরব’ উৎসব সারারাত ব্যাপী নাচ, গান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর ব্লক-১ এর শ্যামরাইপুর, পশ্চিম আম্বা (জগাই) গ্রামের উন্মুক্ত মাঠে পালিত হয়েছিল । বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় দু’তিন হাজার মানুষ, যার ৭০ শতাংশ কোড়া এবং বাকী অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের (সাঁওতাল, লোধা প্রভৃতি) মানুষ উপভোগ করেন বঙ্গা ও বাহা পরব উপলক্ষ্যে উদযাপিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশেষ কারনে কোড়া উৎসব সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের জন্য আমারও উপস্থিতি ছিল সারারাত। বিশেষত, ঐ অনুষ্ঠানে সন্ধ্যাবেলায় ঝড় বৃষ্টির কারনে অনুষ্ঠানটি একটু দেরিতে শুরু হলেও, চলেছিল পরেরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত। আমি সারা রাত্রিই তাদের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে ও উপস্থিত কোড়া আদিবাসীদের কাছ থেকে কোড়া সমাজের পূজা পার্বণ সম্পর্কিত বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করি । রাতে সেদিন তাদের সাথেই নৈশভোজ সারি। তারপর আবার তাদের সাথেই ‘বাহা বঙ্গা’ ও ‘বাহা পরব’ উৎসবে যোগ দেই। তাদের সাথে নাচে অংশ গ্রহণ করে কখন যে আবার সূর্য উঠার সময় হয়ে গেছে সেবিষয়ে আর ভ্রুক্ষেপ ছিলনা।সেই মেলায় বহুবিধ দোকানের সমারোহ ঘটেছিল। যেখান থেকে কোড়া জনজাতিদের খাবারের বৈচিত্রতা সম্বন্ধেও জানতে পারি। সাধারণ খাবারের পাশাপাশি মেলায় পাওয়া যাচ্ছিল বিভিন্ন ধরণের মাদকজাতীয় পানীয়, যেমন মহুয়া, হাড়িয়া ইত্যাদি।
যাইহোক, ভোর হবার পূর্বেই লক্ষ্য করি, ছোট ছোট দলে অনুষ্ঠানের মাঠের প্রান্তে ছেলে মেয়েরা কিছু একটা করছে। কৌতুহল থামিয়ে রাখতে পারলাম না, ছুটলাম সেখানে। দেখি কয়েক জন ছেলে মিলে একটা ছেলেকে ধরে রেখেছে। আর সেই ছেলেটি বিকারগ্রস্থ অবস্থায় তাদের ভাষায় অনর্গল কিছু ব্যক্ত করেই যাচ্ছে । আবার কিছু মহিলা ও মেয়ে একটি মেয়েকে ধরে রেখেছে, সেও ছেলেটির মতো প্রলাপ করছে। এভাবে মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে এরূপ ঘটনা ঘটে চলেছে। অন্যদিকে কিন্তু মাদল ধামসা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে অবিরাম চলছে বাহা সুরের গান আর আদিবাসীদের দলে দলে কোমর ধরে ছন্দ নৃত্য। কিন্তু, আমার মনটা পরে রইল ঐ উন্মাদগ্রস্থ ছেলেমেয়ে গুলোর দিকে। দু’একজন বয়স্ক ব্যক্তির কাছে ছেলে- মেয়েদের এমন উন্মাদনার কথা জানতে চাইলে তারা জানায়- “মারাং বঙ্গা রূম বা ঝুপার”। প্রথমে, কোড়া ভাষায় উচ্চারিত শব্দ বুঝতে একটু অসুবিধা হলেও, কিছুক্ষণেই বুঝতে পারি তারা বলতে চাইছে ভগবান ঐ ছেলে বা মেয়েদের উপর ‘ভর’ করেছে। একজন নৃ-তত্বের গবেষক হিসেবে তাদের এই ‘ভর পরা’, রূম বা ঝুপার (কোড়া ভাষায়) আমার মনে ভীষণ কৌতুহল দানা বাঁধে। সেই সাথে বিভিন্ন প্রশ্নের উদয় হতে থাকে। এই মনস্তত্বমূলক প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই কলম ধরা। যাইহোক, এবিষয়ে তাদের থেকে নৃ-তাত্বিক ক্ষেত্রসমীক্ষার মাধ্যমে যা জানতে পারি, তা হল-
আদিবাসী কোড়া সমাজের মানুষজনেরা বিশ্বাস করেন- এইবিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা মারাং বঙ্গাই সৃষ্টি করেছেন। এই ঈশ্বর বা মারাং বঙ্গা হল ধরাম বঙ্গ, গরাম বঙ্গা, অতে বঙ্গা (বসমতা), সিঙ্গি বঙ্গা (সূর্য দেবতা), ও বেলা চান্দুর (চন্দ্র দেবতা) এর মিলিত রূপ মারাং বঙ্গা বা সর্বশক্তিমান ঈশ্বর। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর মারাং বঙ্গার করুন দয়াতে মানুষ এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে । মানুষ যখন জানতে পারল এই মারাং বঙ্গাই হল তাদের সৃষ্টির কর্তা; তখন থেকেই আদিবাসী কোড়া সমাজের মানুষরা মারাং বঙ্গার বিভিন্ন রূপগুলি পুজো করে আসছে।
যাইহোক, কোড়া সমাজে বিভিন্ন পূজা ও পার্বণে মারাং বঙ্গার ভিন্নভিন্ন রূপগুলি- ধরাম বঙ্গা, গরাম বঙ্গা, অতে বঙ্গা, সিঙ্গি বঙ্গা ও বেলা চাঁন্দুরকে স্মরণের মাধ্যমে বিভিন্ন রকম ফল, মূল, হাঁস, মুরগি ও পাঁঠা বলি দিয়ে দেবতাদের সন্তুষ্ট করা হয়। দেবতার উদ্দেশ্যে যখন তিন ফোটা তেল সিঁদুর মাটিতে ফেলে এবং আদিবাসী বাহা গানের সুরে গান গেয়ে অথবা পরব সুরে গান গাওয়ার সময় ছেলে-মেয়ে থেকে বুড়ো-বুড়ি সকলে সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে বা নাচ করে, ঠিক সেইসময় তাদের মধ্যে অনেকেরই শারীরিক অঙ্গ-ভঙ্গির পরির্বতন ঘটে এবং তারা এদিক ওদিক পাগলের মতো ছুটাছুটি করতে থাকে। সেইমুহুর্তে ঐ সব পাগলপ্রায় ব্যক্তি বা ছেলে মেয়েদের মাটি থেকে শূন্যে তুলে কেউ কানেতে ফুঁ দেয়; কেউবা তার কানে কাপড় দিয়ে চাপা দেয়। এইভাবে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে, যা দেখে কোড়া সমাজের মানুষজনেরা ভাবেন- ওদের মধ্যে মারাং বঙ্গা বা ঈশ্বরের আর্বিভাব ঘটেছে। এই জন্য তারা নিজেদেরকে ধন্য ভাবে। কেননা তাদের বিশ্বাস এই পূজা এবং গানের সুরের মাধ্যমে ঐসব ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা মারাং বঙ্গা’র আর্বিভাব হয়েছে । তাই তাদের পূজো ও গান গাওয়া সার্থক হয়েছে। এই উন্মাদপ্রায় পাগলের মতো অঙ্গ-ভঙ্গিকে কোড়া ভাষায় রূম বা ঝুপার বলে। যাকে আমরা সাধারণত ‘ভর পরা’ বলে থাকি। এই রূম বা ঝুপারের সময় একজন সুস্থ্ ব্যক্তি তার বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো করতে থাকে। যেক্ষেত্রে আদিবাসী কোড়াদের বিশ্বাস, ঐ ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে মারাং বঙ্গার (সর্বশক্তিমান ঈশ্বর) মিলন ঘটেছে। এই সমস্ত কোড়া অধ্যুষিত গ্রামে যখনই কোন পরবে গানের মাধ্যমে বাহা পরবের সুরটি ব্যবহার করে গানটি করা হয়, তখনই কিছু কোড়া পুরুষ বা মহিলা, যুবক বা যুবতী এমন ভাবে ভরে (রূম বা ঝুপার) পরে। তাদের বিশ্বাস, এই গান গুলির সুর বা তাল কোড়া পুরুষ বা মহিলা, যুবক বা যুবতীর মনের ভিতরে বিশেষ আলোড়ন ঘটায়। যে ব্যক্তি মন দিয়ে এই গানগুলির সুর শোনে, তিনি কোথায় যেন মগ্ন হয়ে নিজের জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো অঙ্গ ভঙ্গি করতে থাকে। এছাড়াও কোড়া সমাজে, অনেক সময় বীর শহীদদের স্মরণের গানেও এইরূপ ভর বা রূম বা ঝুপার ব্যাপক প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এরূপ অবস্থায়, কোড়া সমাজের মানুষজনেরা বিশ্বাস করেন যে তাদের বীর শহীদদের আত্মা এই সব ব্যক্তিবর্গের মধ্যে দেখা দেয় পুণ্যবান আত্মা দেবতা রূপে রূপান্তরিত হয়ে। এই সব ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে কোড়া সমাজের মানুষরা বুঝতে পারেন তাদের সৃষ্টির রচয়িতা তাদের পূজাতে ও গানে খুশি হয়েছেন। অর্থাৎ মারাং বঙ্গা স্বয়ং খুশি হয়েছেন । এই কারনেই মারাং বঙ্গা রূম বা ঝুপার মাধ্যমে মানুষজের মধ্যে দেখা দেয়।
যাইহোক, এবার আসি এই ঘটনাগুলির মনস্তাত্বিক বিষয়ে। বিষয়টি নিয়ে কি ভাবেন মনস্তাত্বিকরা ? এই ধরনের ঘটনা হয়তো অনেকেই দেখেছেন নিজের জীবনে। দেখেছেন এর চেয়েও বেশি কিছু। যেমন ধরুন, কোনো ভূতে ধরা কিংবা ভূতের বা ভরে পরা মহিলার উন্মত্ত আচরণ, জ্বলন্ত কয়লাকে হাতে তুলে নেওয়া, জলভর্তি কলসি দাঁতে তুলে লাফ দেওয়া ইত্যাদি আনুষঙ্গিক আরও অন্যান্য কিছু ঘটনা। যেহেতু সেইসব অদ্ভুতুরে ঘটনা দেখে আপনার মনে হয় এর ব্যাখ্যা আপনার কাছে নেই; তাই নিশ্চই এটা অলৌকিক কিংবা ভূতের ব্যাপার স্যাপার। অথচ প্রতিটি ঘটনার পেছনেই থাকে একটা কার্যকারন সম্পর্ক। আসলে, এই পৃথিবীতে ‘অলৌকিক’ নামক কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। সমস্ত তথাকথিত অলৌকিক ঘটনার পেছনে রয়েছে একটা ‘লৌকিক’ বা বিজ্ঞানসম্মত কারণ। এই লৌকিক কারনটাই অনেকের জানা না থাকায় বিষয়গুলো ভৌতিক বা অলৌকিক ইত্যাদি ঠেকে। তাছাড়া এটাও সত্যি, অনেকেই অলৌকিক কিছুতে প্রবল ভাবে বিশ্বাসী, সেই কারনে তারা সবেতেই দেবত্ব, অলৌকিক, ভৌতিক ইত্যাদি ধরে নেন। মনোবিজ্ঞান মতে এইসব ভূতের বা ‘ভরে পরা’ মহিলারা একপ্রকার মানসিক রোগে (Neurotic Disorder) আক্রান্ত। মনোবিজ্ঞান এমন ঘটনাকে প্রধান তিনটে ভাগে ভাগ করেছে। যেমন – (১) Hysteria ( হিস্টিরিয়া)। এরও আবার দু’টি ভাগ আছে। Dissociative Hysteria এবং Convertion Hysteria. (২) Maniac Depressive (ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ)। (৩) Schizophrenia ( সিজোফ্রেনিয়া বা স্কিটসোফ্রেনিয়া)। ‘হিস্টিরিয়া’ কথাটির উৎপত্তি গ্রীকশব্দ ‘Hysteron’ থেকে, যার অর্থ জরায়ু। প্রাচীনকালে গ্রীসদেশের মানুষের ধারণা ছিল জরায়ুর সমস্যা হলে হিস্টিরিয়া হয়। অথচ এই ধারনাটাই মিথ্যে। যেহেতু মহিলারাই এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন, তাই মনে করা হত যে জরায়ুর গোলমালের কারনেই এই রোগের সৃষ্টি। পরে প্রমাণিত হয়েছে, পুরুষেরাও এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন। সাধারণত দুর্বল মস্তিষ্কের ব্যক্তিরা অর্থাৎ যাদের মস্তিষ্কের গতিময়তা কম, অল্পেতেই ভেঙ্গে পড়েন, আবেগপ্রবণ, অন্ধবিশ্বাসী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, শিক্ষার সুযোগ সেভাবে না পাওয়া ব্যক্তিরাই ভূতের বা ভরে আক্রান্ত হন। জল ভরা কলসি দাঁতে করে তোলা, লজ্জা ভুলে প্রচণ্ড লাফ দেওয়া কিংবা কোনও গাছের শক্ত ডাল ভেঙ্গে ফেলা হিস্টিরিয়া রোগীর পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। যাইহোক, প্রাচীনকাল থেকেই হিস্টিরিয়া নামের মানসিক রোগটির অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু তখনকার দিনের ওঝা, গুণীণ, বা জাদু চিকিৎসকরা সঠিক শরীর বিজ্ঞানের ধারণার অভাবে এই রোগকে কখনো বা ভূতে ধরা কখনো বা ঈশ্বরের ‘ভর’ বলে মনে করেছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের চোখে হিস্টোরিয়া বিষয়টিকে বোঝার চেষ্টা করা যাক। সাধারণ সংস্কারে আছন্ন অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত বা বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের আলো থেকে বঞ্চিত সমাজের মানুষদের মধ্যে হিস্টোরিয়া রোগীর সংখ্যা বেশি। সাধারণভাবে এই সব মানুষের মস্তিস্ক কোষের স্থিতিস্থাপকতা ও সৃজনশীলতা কম, যুক্তি দিয়ে বিচার করার চেয়ে বহুজনের বিশ্বাসকে অন্ধ ভাবে মেনে নিতে অভ্যস্থ, মস্তিস্ক কোষে সহনশীলতা যাদের কম তারা একনাগাড়ে একই কথা শুনলে ভাবলে বা বললে মস্তিস্ক-এর বিশেষ কিছু কোষ বারবার উত্তেজিত ও আলোরিত হতে থাকে, এর ফলে অনেক সময় উত্তেজিত কোষগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে অন্যদের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপে বিশৃঙ্খলতা দেখা দেয়।
আর এই মস্তিষ্কের কার্যকলাপে বিশ্ঙ্খলতার ফল স্বরূপই ‘রূম’ বা ‘ঝুপার’ (দেবতার ভর) এর আবির্ভাব হয় কোড়া সমাজে ‘মারাং বঙ্গা’র সময় বাহা সুরের গীতে। যে সময়ে এই সমাজের মানুষেরা ভাবেন ওদের মধ্যে ‘মারাং বঙ্গা’ বা ঈশ্বরের আবির্ভাব ঘটেছে।
আবার এমনও দেখা গেছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-এর সময় এমন কিছু সৈনিক চিকিৎসা নিতে আসেন- যাঁরা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন কিংবা ডানহাত পক্ষাঘাতে অবশ, কিংবা অতীত স্মৃতি হারিয়েছেন। এঁদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে চিকিৎসকরা একমত হন যে- এঁরা কোন শারীরিক আঘাত বা অন্যকোন কারণে এই রোগের শিকার হননি, রোগের কারণ সম্পূর্ণ মানসিক; এঁরা হিস্টিরিয়ায় ভুগছেন। অনবরত রক্তপাত, গোলাগুলির শব্দ রোগীদের চেতনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, কিছুতেই তারা রক্তপাত গোলাগুলির শব্দ সহ্য করতে পারছিল না। মন চাইছিল যুদ্ধ ছেড়ে পালতে, বাস্তবে যা আদৌও সম্ভব ছিলনা। যুদ্ধ ছেড়ে পালানো মানে দেশদ্রোহীতা। ধরা পড়লেই কঠোর শাস্তি। পালাবার ইচ্ছে ও পালাবার ভয় দু’য়ের সংঘাতই রূপান্তরিত হয়েছে হিস্টোরিযায় ।
যাইহোক, ‘মারাং বঙ্গা’র সময় বাহা সুরের গীতে ‘ভরে’র কথায় আশা যাক। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে নাচ-গান করতে করতে আবেগে চেতনা হারিয়ে অদ্ভুত আচরণ করাও হিস্টিরিয়ারই অভিব্যক্তি। সুতরাং বলা যায়, কোড়া আদিবাসীদের ‘বাহা বঙ্গা’ ও ‘বাহা পরব’-এ তাদের কিছু ছেলে মেয়েদের এই অস্বাভাবিক উন্মাদনা মানসিক রোগের বহিঃপ্রকাশ। তাই এই অবস্থাকে মারাং বঙ্গা বা ঈশ্বরের আর্বিভাব না ভেবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার প্রয়োজন। এই ‘ভরে পরা’ বিষয়টি যে কেবলমাত্র আদিবাসীদের মধ্যে দেখা যায় তা নয়, আমাদের বর্তমান সমাজের শহরে বা গ্রামের বিভিন্ন মন্দিরেও পুরোহিত বা পূজারী, সেবকদের ‘ভরে পরা’র কথা শোনা যায়।তাঁদেরও উচিত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া।

গ্রন্থ ঋণ : প্রবীর ঘোষ (১৯৯১), অলৌকিক নয়, লৌকিক (২য় খণ্ড), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment