News Britant

Wednesday, August 17, 2022

ডুয়ার্সের পথে পথে, পর্ব ১

Listen

                                                        স্বর্ণালী ডুয়ার্স যাত্রা ১

 রানা দেব দাশ

ঘোষপুকুর পেরিয়ে গাজলডোবা যাওয়ার বাইপাস রাস্তায় গাড়িটা ঘুরতেই সকলের মনে একটু খুশির হাওয়া খেলে গেল। খানিক আগে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। গুমোট আবহাওয়া কেটে গিয়ে প্রকৃতিতে একটা খুশি খুশি ভাব। আকাশে সাদা মেঘ খেলে বেড়াচ্ছে। আর দূরে ওই মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে নীল কালো পাহাড়।
দুপাশের ঘনসবুজ জঙ্গলের পাশে তিস্তা খালের পাশ দিয়ে মন্দ-ভালো রাস্তায় গাড়ি ছুটে চলেছে ওই পাহাড়ের কাছে। গাড়িতে রবীন্দ্র সংগীত “তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি যাই …..”।

আমাদের ঠিকানা ,নিরুদ্দেশ। দেগঙ্গা থানার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে পরবর্তী পোস্টিং স্থলে যোগদান করার আগে অরূপের এখন লম্বা টানা ছুটি। আমার সামনে শনি রবি সোম তিন দিনের সপ্তাহান্তিক ছুটি। আমার ছেলে ,অরূপের মেয়ের এবারে আইসিএসসি বোর্ড এর মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা ছিল। করোনা আবহাওয়া তা সম্ভব হয়নি। ঘরে থেকে ওদেরও মন খারাপ। পরিবারের লোকেরাও দীর্ঘদিন ঘরবন্দি। আমারতো পায়ের তলায় সর্ষে। তাই আমি নাচালাম। সকালবেলা রায়গঞ্জে ট্রেন থেকে নামিয়ে গাড়িতে চাপিয়ে,” দেখো রে নয়ন মেলে জগতের কি বাহার….” দেখাতে বেরিয়ে পড়া।

হ্যা রায়গঞ্জ থেকে শিলিগুড়ি এই তিন সাড়ে তিন ঘন্টা রাস্তা ওদের কাছ থেকে আমার ছিনতাই করে নেওয়া। রায়গঞ্জে আমি কোথায় থাকি, কোথায় কাজ করি সেটা দেখানোটা ওদের এই ভ্রমণের একটা অংশ বলে আমি কনভিন্স করিয়েছিলাম। বস্তুত অরূপ আমার কোন কর্মস্থলে যায়নি বলে একটা অভিমান আমার জমা ছিল। এ যাত্রায় সেটা মোচন এর সুযোগ আমি ওদেরকে দিলাম আর কি। ভোরের আদর মাখা এত ছোট্ট মিষ্টি উত্তরবঙ্গের এই রায়গঞ্জ শহরটা ওদেরকে না দেখালে আমার যে আত্মতৃপ্তি হয়না। তাই।

গজলডোবায় তিস্তা ব্রিজের মুখটায় থামা হলো। সেই সকালে একটু চাওমিন খেয়ে বেরোনো হয়েছে। মাঝে টানা চার ঘন্টা ড্রাইভার কোথাও দাঁড়ায়নি। তিস্তা ব্যারেজ দিগন্তবিস্তৃত তিস্তা নদী আর তার ডান পাশের তীরে সারি সারি মেলার মত খাবারের দোকান। এগ রোল, চাওমিন, মোমো, কত রকমের মাছ ভাজা– আরো কত কি। ছোটরা নদীর পাড়ে চেয়ার নিয়ে বসে মোমো খেতে খেতে নদীর ছবি তোলায় ব্যস্ত হল। আমরা নিলাম কয়েক প্লেট পিঁয়াজি আর কারি পাতার বড়া। এ সময় আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল না। গলাটাও শুকিয়ে গেছে। একটু ভিজানো দরকার।

অরূপ এর মনটা হয়তো খারাপ। একটা পোস্টিং এর জায়গা ছেড়ে এসে আবার নতুন একটা জায়গায় জয়েন করবে। একটা স্বাভাবিক মন্দলাগা উদ্বেগ কাজ করে। এমনিতে যথেষ্ট শক্ত মনের। তবুও। সেই ভাবনা থেকেই প্রস্তাব দিলাম গরুমারা ফরেস্ট এর মধ্য দিয়ে ড্রাইভ করার। অন্যরা একটু ভয় পাচ্ছিল হয়তো। আমি কিন্তু রাতবিরেতে ওর ড্রাইভের খেয়ালের সাক্ষী আছি বহুদিন ধরে। তাই ড্রাইভার কে পিছনে ফেলে নিজে ওর পাশে খালাসির সিটে বসে পড়া।


গাড়ি এগিয়ে চললো অরূপের খেয়ালে, দুপাশের সবুজ ঠেলে, নদী ব্রিজ পেরিয়ে। পথে ছোট ছোট টিনের বাড়ির জনপদ। শান্ত উদ্বেগহীন জীবন মানুষের। গাড়ি এগোচ্ছে সাউন্ড বক্সের অরিজিত সিং এর গান। পিছনের সিটে কেউ ঝিমোচ্ছে, কেউবা দুপাশের ছবি তুলতে ব্যস্ত। কিলোমিটারের কাটা ষাটের ঘর পেরোলেই সবাই হৈ হৈ করে উঠছে। ব্যস আবার ত্রিশে নেমে যাচ্ছে। বেচারি।
গরুমারা ফরেস্ট এর গভীর সবুজ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে লাটাগুড়ির মসৃণ রাস্তায় গাড়ি চলছে যখন সকলের মনে তখন বৃষ্টির পরে সাদা মেঘের ওই আকাশের মতোই আনন্দ তির তির করে বইছে।
ডুয়ার্স দেখার আনন্দ। হিমালয়ের দুয়ার দেখার আনন্দ। ভুটানের পাদদেশ দেখার আনন্দ। বর্ষার উত্তরবঙ্গ দেখার আনন্দ। এ পরিবেশ ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। এ পরিবেশ ভাওয়াইয়া গান হয়, গোয়ালপাড়িয়া গান হয় মুখে মুখে বর্ণিত হয়। এই পরিবেশ দেবেশ রায়ের কলমে “তিস্তাপারের বৃত্তান্ত” হয়ে পাঠকের মনোরঞ্জন করে। এই পরিবেশে সমরেশ মজুমদার লেখেন কালপুরুষ ,কালবেলা। এই পরিবেশে নকশালবাড়ি আন্দোলন ভারতকে আন্দোলনের নতুন দিশা দেখায়।


আসামি বাঙালি ভোজপুরি মৈথিলী সব ভাষাতেই ডুয়ার্স কথার অর্থ হল দুয়ার বা দ্বার। বাংলার তিস্তা নদী থেকে আসামের ধানসিঁড়ি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকা প্রায় সাড়ে  ৩০০ কিলোমিটার লম্বা। চওড়ায়  ৩০ কিলোমিটার। ডুয়ার্স হল ভুটান প্রবেশের দুয়ার। আঠারোটি রাস্তা দিয়ে এই অঞ্চল থেকে ভুটানের প্রবেশ করা যায়। তার সুযোগ গ্রহণ করে বহুদিন এই এলাকা ভুটানে দখলে ছিল। পরে  ১৮৬৫ সালে ভুটান যুদ্ধের পর ব্রিটিশ কমান্ডেন্ট হেদায়েত আলী এই অঞ্চলকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন। ডুয়ার্সের পূর্বদিককে আসামের গোয়ালপাড়া জেলার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয় আর পশ্চিম দিকে পশ্চিম ডুয়ার্স নামে একটি জেলা গঠন করা হয়। ১৮৬৯ সালে আবার সেই জেলার নাম হয় জলপাইগুড়ি। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ডুয়ার্স অঞ্চল ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়  ১৯৪৯ সালে। ডুয়ার্সে মোটামুটি দুটি অঞ্চলে ভাগ করা। কালিম্পং এর পাদদেশ জলপাইগুড়ি আলিপুরদুয়ার জেলা ও কুচবিহারে উত্তর অঞ্চল নিয়ে বাংলার ডুয়ার্স আর কোকরাঝাড় ও বন্গায়গাঁও জেলা নিয়ে আসামের ডুয়ার্স। পূর্ব থেকে পশ্চিমে এর উচ্চতা গড়ে ৯০ থেকে ১৭০০ মিটার, স্থান বিশেষে।

ভুটানের পাহাড় থেকে জলধারা বয়ে এসে ডুয়ার্স কে করেছে আরো উর্বর, স্নিগ্ধ, সজল। আসামে তা এসেছে ব্রহ্মপুত্র আর মানস হয়ে। বাংলায় তার কত কি নাম। তিস্তা তো আছেই। কোথাও জলঢাকা কোথাও মূর্তি কোথাও তোর্ষা কোথাও সংকোষ, কোথাও বা করতোয়া রায়ডাক, কালচিনি।
যেমন মিষ্টি মিষ্টি নাম তেমনি তার চারপাশে মিষ্টি ঘন সবুজ পরিবেশ। পথের দুপাশে নয়নাভিরাম চা-বাগানে শুধু নয়, মোটা মোটা গগনচুম্বী বিভিন্ন গাছ এর মাধুর্য বাড়িয়েছে। তাই যত রাজ্যের পশুপাখির আশ্রয়স্থল এই ডুয়ার্স অঞ্চল। রাজ্যের মোট বনাঞ্চলের 34 শতাংশ এর দখলে। জলদাপাড়া গরুমারা চাপড়ামারি ন্যাশনাল পার্ক যেমন আছে তেমনি আছে নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক, বক্সা টাইগার রিজার্ভ সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক, মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি।

পথে যেতে যেতে এসব বৃত্তান্ত শোনাচ্ছিলাম ছোটদের, রাস্তায় অনেকক্ষণ গাড়ি চলছে। রাতের ট্রেন জার্নি করে আবার এই দীর্ঘক্ষণের পথযাত্রা। স্বাভাবিক কারণেই ওদেরকে একটু জাগিয়ে রাখার জন্য গল্প করছিলাম ডুয়ার্সের। অরূপ তখন নিজের মনে গাড়ি চালিয়ে চলেছে গুন গুন করে লালন গীতি গাইতে গাইতে। গাড়ি এগোচ্ছে লাটাবাড়ি পেরিয়ে বাতা বাড়ির ভিতর রাস্তায় মূর্তি নদীর দিকে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে নামতে চলেছে তাই আজকের ঠিকানা ঠিক হলো মূর্তি ব্রিজের পাশে কোন একটা রিসর্ট।
সরকারি রিসোর্টগুলো একদম নদীর ধারে খুব সুন্দর অবস্থান। কিন্তু করোনার কারনে বন্ধ। আর বেসরকারি গুলোতে প্রচুর টুরিষ্ট। করোনার প্রভাব একটু কম এর দিকে। তিন দিনের সরকারি ছুটি। তাই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ রসিক মানুষেরা ভিড় জমিয়েছেন এই মূর্তি নদীর পাড়ে, গরুমারা ফরেস্ট এর সীমানায় বিভিন্ন রিসোর্টে।
আমরা কোন সময় নষ্ট করব না। তাই রিসোর্টে অ্যাডভান্স কিছু টাকা দিয়ে মালপত্র গাড়িতেই রেখে বেরিয়ে পড়লাম চালসার উদ্দেশ্যে। ছোট্ট জনপদ চলসার ভিউ পয়েন্ট থেকে ডুয়ার্সের অনেকখানি অঞ্চল দেখা যায়। একটিমাত্র চায়ের দোকান আছে এখানে। সেখানে চা খেয়ে সন্ধ্যা নামার আগে যেটুকু আলো আছে তাতে প্রকৃতিকে চেটেপুটে নেওয়ার জন্য এগোলাম মেটেলি হয়ে সামসিং এর বিস্তৃত চা বাগানের দিকে।
সবুজ কালো কার্পেটের মত সেই চা বাগানে নেমে ফটোসেশন করতে করতেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে গেল ডুয়ার্সের বুকে। সেই সন্ধ্যার বুক চিরে ঘনকালো জঙ্গল পেরিয়ে গাড়ির হেডলাইটে অন্ধকার দেখতে দেখতে আমরা আবার মূর্তি ব্রীজের ধারে আমাদের রিসোর্টে ফিরলাম।
চিকেন পাকোড়া আর ভেজ পাকোড়া দিয়ে চা খাওয়ার পর একটু নদীর ধারে বসবার ইচ্ছে। বাধ সাধল রিসোর্টের ম্যানেজার। এখানে নাকি হাতির খুব উপদ্রব। গতকালকেও কোথায় যেন হাতি একজনকে মেরে ফেলেছে। মাঝেমধ্যেই রিসোর্টের দোরগোড়া পর্যন্ত এসে তাণ্ডব চালায়। অতএব থানা থেকে বারণ আটটার পরে কাউকে বের হতে দেওয়া যাবে না। তাহলে আর নদীর ধারে থেকে লাভ কি। পরিচয় দিয়ে ম্যানেজারকে রাজি করালাম। তিনি বললেন ঠিক আছে ,তাহলে বেশি দূরে যাবেন না। ওরাতো পশু। সরকারি পরিচয় ওরা মানবে না।

ভয় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল গেটের পাহারাদার। নদীর ওপাশে জঙ্গল, ঘনকালোতে কালো হয়ে ওরা মিশে আপনার সামনে চলে আসলেও আপনি টের পাবেন না। আর দৌড়ে পালাবেন তার উপায় নেই। আপনার একশো পা ওদের কয়েক কদম এর সমান। নিমেষে ঘাড়ের ওপর এসে পড়বে। তার পর পা দিয়ে নয়তো শুঁড়ে তুলে …. ..।
নিকষ কালো অন্ধকার, একটানা গর্জিয়ে চলেছে বর্ষার মূর্তি নদী। এই সেদিন এসেও মাঝরাত্রে মূর্তি নদীতে নেমে রবীন্দ্র সংগীত গেয়েছি। আজ যেন ভয়টা একটু বেশিই চেপে ধরল। অরূপ তো অতি সাবধানি। অগত্যা, গেটের সামনেই রাস্তায় খানিকক্ষণের জন্য বসা, তারপর একটু নদীর পাড়ে যাওয়া।
এত ভয় নিয়ে কি বাঁচা যায়। থাক তবে, হোটেলেই ফিরি। সকলে খুবই ক্লান্ত। কাল আবার নতুন দিন। নতুন জায়গা।

….চলবে।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment