News Britant

Thursday, December 8, 2022

পৌরাণিক কাহিনি থেকে রবীন্দ্রনাথ : রাখিবন্ধনের বিবর্তনের ইতিহাস

Listen

( খবর টি শোনার জন্য ক্লিক করুন )

#দেবলীনা ব্যানার্জী: রাখিবন্ধন অর্থাৎ রক্ষাবন্ধন। ভাই বোনের অটুট ভালোবাসার প্রতীক হল রাখী বন্ধন উৎসব। এদিন বোন নিজের ভাইয়ের হাতে রাখী বাঁধেন। ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সাফল্য ও সমৃদ্ধির কামনা করেন বোনেরা। পাশাপাশি ভাই নিজের বোনকে নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। মূলত  শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায় ভাইয়ের হাতে বোনেরা যে রাখি বেঁধে দেন তা ভাইয়ের মঙ্গল কামনার রীতি বা উৎসব। অবাঙালিদের কাছে রাখিবন্ধন তাই রক্ষা বন্ধন নামেও পরিচিত। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন ছয় হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতাতে রাখী বাঁধার প্রচলন ছিল। প্রাচীন ভারতে রানীরা প্রতিবেশী রাজাদের রাখী পাঠিয়ে ভাই বোনের সম্পর্ক তৈরি করতেন। দুর্গাপূজার সময় দশমীর দিন, বিসর্জনের আগে অপরাজিত পুজো ও তারপর অপরাজিত সূতো বাঁধার প্রচলন আছে। প্রাচীন ঐতিহ্যের অনুযায়ী যে উপবীত ধারণ করার প্রথা,  যাতে কম বয়সী ব্রাহ্মণ বালককে উপবীত ধারণ করে গুরুগৃহে শিক্ষালাভ করতে যেতে হত। বাঙালি সংস্কৃতিতে জামাইষষ্ঠীর সূতো, বিপত্তারিনী পুজোর সূতো বাঁধার প্রচলন আছে। বিবাহের সময় মঙ্গলসূত্র পরার প্রথাও এরই একটি বিবর্ধিত রূপ। আসলে সূতো বেঁধে মঙ্গল কামনা ভারতীয় সংস্কৃতির একটি অংশ।  হাতে রাখী বাঁধার মধ্য দিয়েও আসলে এই মঙ্গল কামনা করা হয়, নিজের আপনজন করে তোলা হয়।

রাখি পূর্নিমাকে নিয়ে নানান পৌরাণিক কাহিনি আছে। রামায়ণ অনুসারে ভগবান রাম সমস্ত বানর সেনাদের ফুল দিয়ে রাখি বেঁধেছিলেন। মহাভারতের একটি আখ্যান আছে, যা দিয়ে ভাই বোনের সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে। সুভদ্রা কৃষ্ণের বোন। কৃষ্ণ সুভদ্রাকে যেমন ভালোবাসতেন, দ্রৌপদীকেও তেমনই স্নেহ করতেন। সুভদ্রা একদিন কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন,  দ্রৌপদীকে এত স্নেহ করার কারণ কি? কৃষ্ণ বললেন, যথাসময়ে তুমি এটা বুঝতে পারবে। এর কিছুদিন পর একদিন কৃষ্ণের হাত কেটে গেল। সুভদ্রা দৌড়ে গেল কাপড় আনতে। এরমধ্যে দ্রৌপদী এসে নিজের মূল্যবান কাপড় ছিঁড়ে হাত বেঁধে দিলেন। তখন কৃষ্ণ সুভদ্রাকে বললেন কেনো আমি দ্রৌপদীকে এত স্নেহ করি বুঝলে। কুরুক্ষেত্রের পাশাখেলার পর বস্ত্রহরণের চরম লজ্জাজনক অবস্থায় দ্রৌপদীকে রক্ষা করে কৃষ্ণ এই বস্ত্রখন্ডেরই ঋণশোধ করেছলেন। ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণুপুরাণে আরেকটি উপাখ্যান আছে। দৈত্যরাজ বালি ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। বিষ্ণু বৈকুন্ঠ ছেড়ে বালির রাজত্ব রক্ষা করতে চলে এসেছিলেন।  স্বামীকে ফিরে পাবার আশায় বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী,  একজন সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে বালি রাজার কাছে আসেন। বালিরাজার হাতে রাখি বেঁধে তাকে সবকিছু খুলে বলেন। বিস্মিত বালি সবকিছু শুনে বিষ্ণুকে বৈকুন্ঠে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। কথিত আছে যে আলেকজান্ডার ও রাজা পুরুর সঙ্গে যুদ্ধের সময় আলেকজান্ডারের স্ত্রী পুরুর কাছে একটি রাখি পাঠিয়ে স্বামীর কোনো ক্ষতি না করার প্রার্থনা করেছিলেন। পুরু রাখির মর্যাদা রেখে আলেকজান্ডারের কোনো ক্ষতি হতে দেন নি। আরেকটি জনপ্রিয় গল্প অনুসারে চিতোরের রানি কর্ণবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ূনকে একটি রাখি পাঠান। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করলে রানি অসহায় বোধ করে রাখি পাঠিয়ে  হুমায়ুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। অভিভূত হয়ে হুমায়ুন চিতোর রক্ষা করতে সৈন্য প্রেরণ করেন। চিতোরে পৌঁছে হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে উৎখাত করেন এবং কর্ণবতীর ছেলেকে সিংহাসনে বসান। কোনো কোনো ঐতিহাসিক গল্পটির সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে সপ্তদশ শতকের রাজস্থানের লোকগাথায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

আরেকটি পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে যম তার বোন যমুনাকে অনেকদিন দেখতে যাননি। অনেকদিন পর যখন গেলেন, যমুনা তার জন্য সুন্দর রান্না করলেন ও তার হাতে রাখি বেঁধে দিলেন। আনন্দিত যম যমুনাকে অমরত্তের আশীর্বাদ করেছিলেন। আরেকটি পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে অসুরদের হাতে স্বর্গপুরীর পতন ঘটলে হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধারের আশায় ইন্দ্র যখন বৃহস্পতির সঙ্গে আলোচনায় বসেন তখন তার হাতে ইন্দ্রের স্ত্রী একটি কবচ বেঁধে দেন। এর থেকে তিনি সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন এবং কর্মে সিদ্ধিলাভ করবেন ও রাজ্য পুনরুদ্ধার করবেন। ওই রক্ষাবন্ধন শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমাতে হয়েছিল এমন কথা পৌরাণিক মতে বলা হয়। তবে এই আখানটির উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এটি কোনো ভাইবোনের মধ্যে নয় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঘটেছিলো। হয়তো পরবর্তীকালে সেটিই পরিবর্তিত হয়ে ভাইবোনের মধ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। রাখিকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়,  এই বন্ধনে বোনেরা ভাইয়ের জন্য দীর্ঘ সুখী জীবনের প্রার্থনা করেন আর ভাইয়েরা বোনেদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তামিলনাড়ু সহ দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় জানুয়ারি মাসে পোঙ্গাল উৎসবের সময় বোনেরা ভাইয়ের হাতে রাখি বাঁধে। বাংলায় রাখিবন্ধন অবশ্য অন্য একটি কারণে বিখ্যাত। বাঙালিদের কাছে রাখি কেবলই ভাই বোনের মধ্যে আবদ্ধ নয়।  ধর্মীয় ও সামাজিক গণ্ডি পেরিয়ে রাখিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও জায়গা দিয়েছে বাঙালিই। আর বাঙালির এই রাখি বন্ধনের প্রসঙ্গে উঠে আসবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে রাখিকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই  বছরের ২০ জুলাই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের কথা ঘোষণা করে। জানানো হয়, এই আইন কার্যকরী হবে ১৯০৫-এরই ১৬ অক্টোবর, বাংলায় ৩০ আশ্বিন। সেই সময়ে  ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় মানুষ সামিল হয়। ঠিক হয়, ওই দিন বাংলার মানুষ পরস্পরের হাতে বেঁধে দেবেন হলুদ সুতো। এই দিনকে মিলন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। কবিগুরু এই দিনটিকে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করার ডাক দেন। বাংলায় হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বকে ফুটিয়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেন রবীন্দ্রনাথ।

এই রাখি বন্ধন উৎসব শ্রাবণ মাসে বা পূর্ণিমা, কোনওটাতেই হয়নি। শুধু বোনেরা ভাইদের নয়, এই দিন প্রত্যেক মানুষের মধ্যের একতাই ছিল রাখি বন্ধনের মূল বিষয়। এই  রাখিবন্ধন উৎসবে সম্প্রীতি যে ভাবে জায়গা করে নিয়েছিল, তা আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ এই রাখি বন্ধন উৎসব নিয়েই গান লিখেছিলেন, বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল / পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, হে ভগবান। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ৩০ আশ্বিন রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে রাখি বন্ধন উৎসব পালিত হয়। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার রাখিবন্ধন উৎসবের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এই রাখির মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানবিকতা, সম্প্রীতি ও একতা। রাখিবন্ধনের ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যায় রামায়ণ অনুযায়ী, ভগবান রাম সমস্ত বানর সেনাদের ফুল দিয়ে রাখি বেঁধে ছিলেন। রাখি বন্ধন ভারতীয়দের মধ্যে একটি বন্ধনের উৎসব। যুগের তালে চলতে চলতে ক্রমশ আমরা হারিয়ে ফেলছি বন্ধনের ধারণা। যে বন্ধন সৌহার্দ্যের। যেখানে স্বাধীনতার মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। এই বন্ধন অটুট করতেই কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ৩০ আশ্বিন রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে রাখি বন্ধন উৎসব পালিত হয়। সাম্প্রদায়িকতা মেটাতে রবীন্দ্রনাথ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রাখি বন্ধন উৎসব প্রচলন করেন। কেনো দরকার পড়েছিলো অকালে রাখিবন্ধন উৎসবের?  ঠিক যেকারণে অকালে রামচন্দ্র দেবীর বোধন করেছিলেন। সংকটকালে সময় অসময়ের বিচার নিস্প্রয়োজন। তখন সময়কাল ১৯০৫ এর ১৯ জুলাই। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণা করলেন। অবিভক্ত বাংলাকে শোষণ করা সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল ক্রমশ। তাই  প্রশাসনিক কারণে ইংরেজ শাসকরা ঠিক করলেন, ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ভাগ করা হবে বাংলাকে। হিন্দু জনসংখ্যার আধিক্যযুক্ত অঞ্চল আলাদা করা হবে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলা থেকে। বাংলার মুসলিমদের এমন মগজ ধোলাই ততক্ষণে হয়ে গেছে, তাঁরা প্রায় খুশি মনেই মেনে নিয়েছেন প্রস্তাব।

তখনকার অবিভক্ত বাংলা মানে কিন্তু বাংলা, বিহার, আসাম, শ্রীহট্ট সবটা মিলে। তত দিনে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে বাংলা। ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে ভাগ করে দিয়ে বিদ্রোহের গতি কমিয়ে আনা। অতএব পাশ হয়ে গেল বঙ্গ ভঙ্গের প্রস্তাব। সময়কাল শ্রাবণ মাস, ১৬ আগস্ট। কাকতালীয় ভাবে সেটা ছিল রাখি পূর্ণিমা। হিন্দু ঘরের মেয়েরা তাদের ভাই-এর হাতে পরাবে রাখি। অন্যরকম রাখি বন্ধনের কথা মাথায় এল রবীন্দ্রনাথের। ভাই-বোনের নয়, রাখিবন্ধন হয়ে উঠল হিন্দু-মুসলিমের সম্প্রীতি উৎসব। এ ধর্মের মানুষ ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে হাতে রাখি পরিয়ে দিচ্ছে যার হাতে, তার ধর্ম আলাদা। হাতে হাত রেখে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হল প্রতীকী প্রতিবাদ। একটা মানুষের ডাকে ধর্ম নির্বিশেষে সারা বাংলা এক হয়েছিল সে দিন। প্রতিবাদের ভাষা, চরিত্র বদলেছে ক্রমশ। দীর্ঘ ৬ বছর পর ১৯১১ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ রদ করে দেন বাংলা ভাগের প্রস্তাব। সেই থেকে রাখিবন্ধন উৎসব বাঙালির কাছে তার ধর্মের বেড়াজাল খসিয়ে অকালবোধনের মতই শক্তিশালী রূপে হয়ে উঠেছে সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক। রাখিবন্ধনের দিনটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ভাবে পালন করা হয়। দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণরা এই দিনে নদীতে স্নান করে উপবীত পাল্টান, এবং আগামী দিনগুলি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হিসেবে কাটানোর শপথ নেন। পশ্চিম ভারতের সমুদ্র উপকুলবর্তী এলাকায় মানুষ,  মূলত মৎসজীবীরা সমুদ্রকে শান্ত করার জন্য এই দিনে নারিকেক উৎসর্গ করে। গুজরাটে বলা হয় এই দিন শিবের পুজো করলে সব পাপ ধুয়ে যাবে। জম্মুতে এই দিনে ঘুড়ি ওড়ানোর আয়োজন করা হয়। উত্তরাখন্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই দিনে নতুন উপবীত পরার প্রথা আছে। মধ্য ভারতের নানা অঞ্চলে এই দিনটি কাজলি পুর্নিমা হিসেবে পালন করা হয়। মূলত পুত্রবতী মহিলারা গম গাছের অঙ্কুরকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালন করেন আরও ভালো শস্যর প্রার্থনা জানান। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে এই দিনটি বলভদ্রর জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়।  এদিন সুভদ্রা জগন্নাথ ও ভদ্রকে রাখি পড়ান।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment