News Britant

Wednesday, August 17, 2022

ডুয়ার্সের পথে পথে ২

Listen

#রাণা দেব দাশ: ভোরবেলা সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ঘুমটা ভেঙে গেল। আগের রাতে সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘুমিয়েছি। হাতির ডাকে ঘুম ভেঙে যাওয়ার একটা দুরাশা নিয়ে। না হাতিও আসেনি। ক্যানেস্তারা পেটানোর বা পটকা ফাটানোর  শব্দে আওয়াজে ঘুমও ভাঙেনি। অথচ রোজই হাতি নাকি কাছাকাছি গ্রামে ঢুকে পড়ে। সবকিছু তছনছ করে। লোকও মারা যায়। খানিকক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করলাম। এই এক অভ্যাস। একবার ঘুম ভাঙলে আর ঘুম আসে না। আর সকালের আলো চোখে পড়লে তো কথাই নেই। সে যত রাতেই শুই না কেন। দরজা খুলে ব্যালকনিতে বেরোতেই দেখি প্রকৃতি মায়াবী ঊষার রঙে রাঙিয়ে চারিদিক সাজিয়ে রেখেছে।

মন ভালো করে দিলো সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া বর্ষার ভরা নদীর একটানা গর্জন। ওপাশে ঘনসবুজ গরুমারা ফরেস্ট।  কাক শালিক আরো কত নাম না জানা পাখি তাদের নিজস্ব ভাষায় কিচিরমিচির করে চলেছে চারিদিকে। খানিকক্ষণ দুচোখ ভরে ডুয়ার্সের ভোরবেলাটা মনে মেখে নিলাম। একা একা। এবার একটু হাঁটতে বেরোব। ছেলেকে, ছেলের মাকেও সঙ্গে নিলাম। ছেলেকে তো জোড় করে তুললাম। নিরুত্তাপ নিস্তরঙ্গ প্রকৃতির মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম মূর্তির ব্রিজ। ব্রিজের ওপারে গরুমারা ফরেস্ট। ভোরবেলা বোধহয় কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। সকালের আকাশ পুজোর আকাশের মত নীল সাদা রঙে মাতিয়ে রেখেছে।

নদীতে খানিকক্ষণ পা ভিজিয়ে ব্রিজ দিয়ে একটু একটু করে হেঁটে গরুমারা ফরেস্টে ঢুকলাম। এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে। চাপড়ামারি ও চালশা যাওয়া যায়। কিন্তু পদব্রজে যাওয়ার বিধিনিষেধ আছে কিনা বুঝতে পারলাম না। যাওয়াটা কতটা নিরাপদ তাও বুঝলাম না। তবে কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। ডুয়ার্সের ঘনসবুজ জঙ্গলে পশুপাখির বৈচিত্র উল্লেখ করার মতো। হাতি, গন্ডার তো আছেই, রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও আছে নানা প্রজাতির চিতা বাঘ। আছে বড় বড় অজগর সাপ ভীষন বিষধর কেউটে সাপ, ভয়ানক হিংস্র ভল্লুক, নানা প্রজাতির হরিণ। রেড পান্ডা ম্যাকাও গ্রে লেঙ্গুর জঙ্গলের সংসারকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।

সাধারণ শিয়াল ছাড়াও হিংস্র নেকড়ে এখানে জঙ্গলকে  বিপজ্জনক করে তুলেছে। নদীতে কেও ঝুঁকির করে তুলেছে কুমির ও ঘড়িয়ালের উপস্থিতি। জঙ্গলে বিভিন্ন মোরে মোরে দেখেছি হাতির করিডর। সুতরাং ডুয়ার্সের জলে ভয়, জঙ্গলেও ভয়।আর হাতিতো জনপদে ঢুকেও মানুষ মারে।  তবু জঙ্গলের ভেতরে একটু হেঁটে আসার লোভটা ছাড়তে পারলাম না। ব্রিজের উপর ওদিক থেকে হেঁটে আসা এক ষাটোর্ধ দম্পতি ইচ্ছাটা আরো বাড়িয়ে দিল।  আমরা এগোলাম কিছুটা গাড়ি যাওয়ার রাস্তা ধরে ভেতরের দিকে। দুপাশে ঘন জঙ্গল। একটানা পাখির এবং কীটপতঙ্গের ডাক। কি জানি  আড়ালে হয়তো কয়েকজোড়া চোখ আমাদেরকে নজরে রেখেছে। যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে বিপদ। খানিকক্ষণ হাঁটার পর থামলাম। এবার ফিরতে হবে।

আজকের গন্তব্য ঝালং বিন্দু। একটু সময় পেলে যদি শেষ বিকেলে যদি সুনতালেখোলা যাওয়া যায়। পুরী তরকারি আর ডিম সেদ্ধ দিয়ে ভরপেট ব্রেকফাস্ট করে সকলে মিলে বেরোলাম। জঙ্গলের পথ তাই গাড়িচালক যথারীতি অরূপ। মূর্তি  নদীর ওপর সেতু পেরিয়ে গরুমারা ফরেস্ট এর মধ্য দিয়ে খুনিয়া মোড় হয়ে এবার ঢুকলাম চাপড়ামারি ফরেস্টে। গাড়িতে গান বাজছে,”তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি যাই….”। বড় প্রিয় রবীন্দ্র সংগীত আমার। খুব প্রাসঙ্গিক। এ রাস্তায় আমার কয়েক বার আসা। বাকি সকলের প্রথমবার। তাই দুচোখ ভরে শুধু সবুজের মধ্যে ডুবে যাওয়া। বিভিন্ন রকমের পাখি আর লেঙ্গুর দেখতে দেখতে চাপড়ামারি ফরেস্ট এর মধ্যে লেভেল ক্রসিং এসে থামলাম।

জায়গাটা বড় সুন্দর। দু’পাশে ঘন জঙ্গল কেটে রেললাইন চলেছে। নিঝুম নিস্তব্ধ চারিদিক। কিছুক্ষণের ফটোসেশনের বিরতি। তারপর জঙ্গলের পথ ধরে আবার চলা। চাপড়ামারি শেষ হতে ডানদিকে বাঁক নিয়ে আবার জঙ্গল। এবার গৌরীবাস গ্রামের দিকে। তবে এই জঙ্গলের রূপ আরো সুন্দর। দুপাশের উঁচু উঁচু রাবার গাছের সারি। গাছের ছাল কেটে সেখানে প্লাস্টিকের ব্যাগ ঝোলানো। গাছ থেকে নিঃসৃত রস সেখানে সংগ্রহ করে ক্যেমিক্যাল প্রসেস এর মাধ্যমে রাবার তৈরি করা হয়। উচ্চতার ভেদে সবুজের বৈচিত্র্য বদলে যায়। এবার আমরা উঠছি একটু উঁচুর দিকে। বিন্দু ঝালং এর রাস্তায়। ঘন সবুজ জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে এক চিলতে সমতল ভূমি।

আবার দূরে কালো পাহাড়। কখনো ঘন নীল কখনো বা সবুজ পাহাড়। নিচের দিকে তাকালে প্রকৃতির বুক চিরে এগিয়ে চলেছে জলঢাকা নদী। ভুটান থেকে সদ্য আশা।  গৈরিবাস এ ভিউ পয়েন্টের পাশে একটা চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার পথচলা। এবার বেশ কিছুটা উপরে উঠে গেছি। পাহাড়ের রাস্তা। তাই সকলের সম্মিলিত অনুরোধে অরূপকে চালকের আসনে থেকে নামানো হলো। আরো একঘন্টা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে  ঝালং নদী, ঝালং বনদপ্তরের বাংলো সব টপকে পৌঁছলাম বিন্দু। আর আকাশ যেন আমাদের দৃশ্য সুখ দেওয়ার জন্য রৌদ্রোজ্জ্বল। সবকটা পাহাড়ের চূড়া আর নিচে প্রবাহমান নদী সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। নবকুমারের কথায়, “আহা কি দেখিলাম জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না”। কাছেই জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

আর সেই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে জল যোগাতে ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা জলঢাকা নদী কে চারটে লকগেটের ব্যারেজ দিয়ে আটকানো হয়েছে বিন্দুতে। ওপাশে ভুটান। অর্থাৎ ভুটানের আগে শেষ ভারতীয় পয়েন্ট বিন্দু। এখানেই এবড়ো খেবড়ো পাথরের উপর প্রবল গতিতে নেমে আসছে জলঢাকার জলধারা। চারিদিকে অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য। লোকে আসছে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তুলছে। কেউ কেউ পাথরের উপর বসে থাকছে ঘন্টার পর ঘন্টা। কেউবা জলে পা ডুবিয়ে ঠান্ডা জলের পরশ নিচ্ছে। আমাদের সবাই যে কত রকম পোজ দিয়ে ছবি তুললো!!!  অরূপ গাইলো গান। আমি একটা উঁচু পাহাড়ের উপর গিয়ে বসে সব দেখতে লাগলাম। ঘন্টাখানেক এভাবে কাটানোর পর আকাশের মুখ ভার হলো। ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিলো সবাইকে। এক ছুটে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ফেরার পথে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পারেন গ্রামের কাছাকাছি আসতে বৃষ্টি থেমে গেল।

গাড়ি একটু কষ্ট করে লোয়ার পারেন থেকে আপার পারেন এর দিকে নিয়ে গেলাম। পারেনে দু-একটা হোমস্টে আছে।  শান্ত পাহাড়ি গ্রামের মধ্যে। চারদিক অপরূপ দৃশ্য। ভারী সুন্দর এদের আতিথেয়তা। আমরা কথা বললাম। নম্বর নিলাম। পথের ঝালং নদীর পাশে বনদপ্তর এর লজ এবং হাট নজরে পড়লো। খুব সুন্দর অবস্থান। ঝালং নদীর নৈসর্গিক দৃশ্যের মাঝে। কাছেই ঝালং নদী জলঢাকাতে  মিশেছে। করোনার পরিস্থিতিতে বনদপ্তরের বুকিং বন্ধ। তাই আবার ফিরে চলো লাটাগুড়ির পথে। কিছুটা দেখেশুনে মূর্তি নদীর পারে অপেক্ষাকৃত নির্জন এক প্রান্তরে শ্যামলী নামের একটি রিসর্টে উঠলাম। লোকজন কম। পরিবেশ এর বৈচিত্র এবং সাজানো গোছানো ঘর এবং পরিবেশ দেখে ভালো লেগে গেল। কিন্তু এখানে থাকতে গিয়ে কি বিরম্বনায় পড়েছিলাম গোটা রাত্রি সে গল্প আবার পরে করব। আপাতত বিশ্রাম। রাতের গল্প পরে।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment