News Britant

Wednesday, August 17, 2022

ঘুমন্ত ‘প্রাণ’ জেগে ওঠে যে ছবিতে, শংকর দেবনাথের এই ছবি চেতনার মৃতসঞ্জীবনী

Listen

#দেবলীনা ব্যানার্জী: ‘এ সভ্যতা বোধহয় আর সবুজ চায় না, মানুষ মনে করে এ পৃথিবী তার একার সম্পত্তি’। সভ্যতার অগ্রগতি কি প্রকৃতির বলিদান চায়! ইঁট কংক্রিটের ইমারতের ভেতর থেকে উঁকি মারে সবুজ প্রাণ। এই চিরচেনা অথচ চিরবিস্মৃত সত্যের ঝলক নিয়ে হাজির শংকর দেবনাথের ছবি ‘প্রাণ’। অতিমারি পরবর্তী পৃথিবী যে সংকটময় পরিস্থিতির শিকার, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ‘প্রাণ’ কে খুব সমসাময়িক ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।

আসলে এগোতে গিয়ে আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই আমাদের শেকড় কোথায়! ছিন্নমূল হয়ে কিছুটা হাওয়ায় ভাসতে থাকা আমাদের জীবনকে অমোঘ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় এই ছবি। উত্তরের অপেক্ষা না করেই বা বলা যায় কোনো উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও না করে খুব সাধারণ মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনকে রূপকের মত করে ব্যবহার করেছেন পরিচালক। মুখ্য চরিত্রে ‘প্রাণ’ ‘বৃষ্টি’ ‘সবুজ’ ইত্যাদি চরিত্রগুলির নামকরণও অনেকটাই রূপকধর্মী এখানে। তাই গল্প শেষ হলেও কোনো সমাধানের ইঙ্গিত নেই, জীবন চলতে থাকে নিজের মতই, শুধু কিছু না বলা কথা যা মনে গভীর দাগ কেটে যায়।

অভিনেতা হিসেবে শংকর দেবনাথ নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছেন বারবার। সম্প্রতি ‘মন্দার’ এ তাঁর অভিনীত চরিত্র বঙ্কা বহুল প্রশংসিত।  পরিচালক হিসেবে নিজের প্রথম ছবি ‘পাকারাম’ এ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি। সেইদিক থেকে দেখতে গেলে ‘প্রাণ’ তাঁর নির্দেশনায় দ্বিতীয় ফিচার ফিল্ম। এক ঘন্টা তেরো মিনিটের ছবিতে পরিবেশ, দূষণ, সবুজায়ন সবকিছু একসাথে কোলাজধর্মী হয়ে একটি গল্প হয়ে ওঠে। মানুষ যেখানে মুখ্য চরিত্র নয়, পুরো গল্পটাই একটা চরিত্র। গল্পে গ্রামের ছেলে প্রাণ কাজের সন্ধানে শহর কলকাতায় আসে।

হোর্ডিং, ব্যানার লাগানোর কাজ করতে করতে পোস্টারে ‘ফুৎকারে রোজগার’ এর সন্ধান পায় সে। এগ্রিমেন্ট সই করে কাজে যোগ দেয় সে। কিন্তু কাজের প্রকৃত স্বরূপ যে তার হৃদয়ের পরিপন্থী। গাছপাগল বাবার ছেলে, গাছপূরাণের উত্তরাধিকারী ‘প্রাণ’ কি পারবে নিজের ছেলেবেলাকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র রুজিরোজগারের জন্য এমন কঠোর কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে! এর বেশি বলা উচিত না, ছবিটি নন্দন ২ তে দর্শকাসন পূর্ণ করে রমরমিয়ে চলছে। কোনো প্রচার ছাড়াই ভালো বাংলা ছবির দর্শক হলে পৌঁছে গেছেন।

অভিনয়ে রাজু মজুমদার,  নিমাই ঘোষ, চন্দন ঘোষের মত অভিনেতাদের পাশাপাশি অনেক নতুন মুখ নজরে পড়ে। ছবির সঙ্গীত প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ও সাউণ্ড ডিজাইনিং করেছেন সুকান্ত মজুমদার।  এমন একটি বিষয় নিয়ে ছবি নির্মাণ করে অবশ্যই কুর্নিশের দাবি করেন অভিনেতা শংকর দেবনাথ। গল্প ও চিত্রনাট্য তাঁর নিজের। ছবি সম্পর্কে শংকর দেবনাথ জানান, ‘ছবিটা তৈরি হয়েছিলো ২০১৭ তে, এরপর ২০১৯ এ কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটা দেখানো হয়। এরপর লকডাউন এসে যায়।  এবার আমাদের মনে হল লকডাউন পরবর্তী সময়ে ছবিটির গল্প খুব প্রাসঙ্গিক।

এখন এটা রিলিজ করা যায়। ছবিটি বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে বানানো হয়নি। খুবই এক্সপেরিমেন্টাল একটা ছবি। পুরো ছবিতে আমাদের রোজকার জীবনে চারপাশে যে শব্দ শোনা যায়, তাই রাখা হয়েছে।  আমরা যখন যা ক্যামেরা পেয়েছি,  তা দিয়েই শ্যুট করেছি নিত্যদিনের জীবনকে। তার ছোঁয়া ছবিতে পাবেন। প্রথমে তো কোনো স্ক্রিপ্টও ছিল না। দৃশ্যের কোলাজ ধীরে ধীরে গল্পের অবয়ব পেয়েছে।’

বস্তুতই এমন ছবি কোনো আগে থেকে লেখা গল্পকে নির্ভর করে হতেই পারে না, প্রতিদিনের জীবনের কিছু কোলাজ একসাথে জুড়ে গল্প হয়ে ওঠে এখানে। সেই গল্প পরিণতি পায় এক গাছপাগলের মৃতদেহ ও ধাপার মাঠের একটি সবুজ গাছের অস্তিত্বের ওপর।  গল্প শেষ হয়ে যায় কিন্তু গল্পের রেশ মনের গহীনে আলোড়িত করতে থাকে গাছপাগলের শব্দগুলিকে,

“হেমন্ত বসন্ত চলে গেছে,  শরৎ ও মরলো বলে

ঋতু বলে আর কিচ্ছু থাকবে না

আমরা সার সার মরা গাছ দেখতে পাই 

রাস্তার দুপাশে।”

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment