News Britant

Thursday, August 11, 2022

ইউক্রেনে সাময়িক যুদ্ধবিরতি মানছে না রুশ সৈন্যরা

Listen

#হাবিবুর রহমান, ঢাকা: ইউক্রেনের দুটি শহর মারিওপোল ও ভলনোভাখায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে রাশিয়া। বেসামরিক লোকজন যেন নিরাপদে সরে যেতে পারে সেজন্যই এ ঘোষণা। শনিবার বিষয়টি ‘মানবিক করিডোর’ হিসেবে বর্ণনা করে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির কথা জানায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়াও এ বিষয়ে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। অপরদিকে ইউক্রেনের সমুদ্র-তীরবর্তী শহর মারিউপোল ও ভোলনোভখার বেসামরিক লোকজনকে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও রুশ সৈন্যরা তা পুরোপুরি মানছে না। মারিউপোলে এখনও তারা গোলাবর্ষণ করছে বলে শনিবার অভিযোগ করেছেন শহরটির ডেপুটি মেয়র সেরহি ওরলভ।

জানা গেছে, শনিবার, মস্কোর স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা) এই বিরতি কার্যকর হবে। ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের সামরিক প্রশাসন থেকে তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে শহর অবরুদ্ধ করে রাখার পরিপ্রেক্ষিতে মারিওপোল মেয়র ভিডিয়াম বোইচেঙ্কো একটি ‘মানবিক করিডোর’ ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে যুদ্ধের দশম দিনে এসে সাময়িক বিরতি ঘোষণা করা হল রাশিয়ার পক্ষ থেকে। চলতি সপ্তাহে বেলারুশে দ্বিতীয় দফার শান্তি বৈঠকের পরে রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের বেসামরিক বাসিন্দাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে একমত হয়েছিল মস্কো। তারই ভিত্তিতে এই ঘোষণা বলে মনে করা হচ্ছে।

বেসামরিক লোক সরে গেলেই পূর্ণশক্তিতে আক্রমণ করবে রাশিয়া: বেসামরিক লোকজনকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে ইউক্রেনের দুটি শহরে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে রাশিয়া। একে ‘মানবিক করিডোর’ হিসেবে বর্ণনা করছে তারা। পূর্ব ইউক্রেনের এ শহর দুটির দখল নিতে শুরু থেকেই প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রুশ বাহিনী। ফলে বেসামরিক লোকজন সরে গেলে সেখানে পূর্ণশক্তিতে আক্রমণ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মারিওপোল অবরুদ্ধ করে রেখেছে রুশ বাহিনী। সাড়ে চার লাখ মানুষের এই শহরটিতে রাশিয়া ব্যাপক গোলাবর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ করেছে ইউক্রেন। মারিয়াপোলের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় বন্দর নগরী রাশিয়ার হাতে চলে যাবে। এর মাধ্যমে রুশপন্থি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের সঙ্গে রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া দ্বীপপুঞ্জের করিডোর তৈরি হবে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নিয়েছিল রাশিয়া। ভলনোভাখা শহরটির তেমন পরিচিতি না থাকলেও রাশিয়ার কাছে এটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আক্রমণ শুরুর পর থেকেই শহরটিতে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। দোনেৎস্ক ও মারিয়াপোলের সংযোগ সড়কের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে কৌশলগত দিক থেকে ভলনোভাখা এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

আবার বৈঠকে বসতে চায় ইউক্রেন: ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে দুই দফা বৈঠক হয়েছে, তবে এ বৈঠক থেকে তেমন কোনো ফল আসেনি। এবার তৃতীয় দফা বৈঠকে বসতে চাচ্ছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্টের একজন উপদেষ্টা গত শুক্রবার এসব কথা জানান। চলতি সপ্তাহেই বৈঠকের কথা বলেন তিনি। ইউক্রেনের পক্ষে গত দুই বৈঠকে অংশ নেয়া ওই কর্মকর্তা স্থানীয় সময় গত শুক্রবার বলেন, মস্কোর সামরিক আগ্রাসনের কারণে শুরু হওয়া লড়াই বন্ধে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৃতীয় দফা বৈঠকে বসার পরিকল্পনা করছে ইউক্রেন। কিয়েভ চলতি সপ্তাহেই রাশিয়ার সঙ্গে এই বৈঠকে বসতে চাচ্ছে বলেও জানান তিনি। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলিয়াক বলেন, আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। কাল বা পরশু বৈঠক হতে পারে।

পোদোলিয়াক বলেন, তৃতীয় দফা বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্রেমলিন থেকে উত্তরের অপেক্ষায় আছে কিয়েভ। বার্লিনে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বলেন, তিনি পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, সপ্তাহ শেষে আলোচনা আবার শুরু হবে। বেলারুশ-ইউক্রেন সীমান্তে এর আগে দুই দফা বৈঠক হলেও তা যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থ হয়েছে। তবে উভয় পক্ষ বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মানবিক করিডর তৈরিতে রাজি হয়।

ন্যাটোকে তুলোধুনো করলেন জেলেনস্কি: চলমান রুশ আগ্রাসন বাধাগ্রস্ত করতে ন্যাটো ইউক্রেনের আকাশসীমাকে ‘নো ফ্লাই জোন’ হিসেবে ঘোষণা করতে ন্যাটোকে অনুরোধ করেছিল কিয়েভ; কিন্তু ন্যাটো তাতে কর্ণপাত না করায় পশ্চিমা দেশগুলোর এই সামরিক জোটের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদোমির জেলেনস্কি। গত শুক্রবার কিয়েভে নিজ কার্যালয় থেকে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ন্যাটোর সব সদস্যরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো শত্রুর পরিকল্পনা সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই সচেতন। তারা নিশ্চিত যে, রাশিয়া তার আক্রমণত্মক কর্মকাণ্ড জারি রাখবে। কিন্তু ন্যাটো ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনের আকাশকে নো ফ্লাই জোন হিসেবে ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকছে। ন্যাটোর সদস্যদের ধারণা, এই ঘোষণা দিলে রাশিয়াকে ন্যাটোর বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করার উস্কানি দেয়া হবে। দুর্বল ও নিরপত্তাহীনতায় যারা ভোগে, তারা অনেকসময় নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এক প্রকার সম্মোহনমূলক ধারণা তৈরি করে; ন্যাটোও তাই করছে। অথচ এই জোট আমাদের চেয়ে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী।

ন্যাটোকে তিরস্কার করে ভিডিওবার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ‘আজ থেকে ইউক্রেনে যত মানুষ মারা যাবে, তারা মরবে আপনাদের কারণে। আপনাদের দুর্বলতা ও বিচ্ছিন্নতার কারণে এবং মনে রাখবেন, যদি ইউক্রেনের পতন হয়, গোটা ইউরোপের পতন হতেও বেশিদিন বাকি নেই।’ পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য কয়েক বছর আগে আবেদন করে ইউক্রেন এবং এই ব্যাপারটিকে ঘিরে দ্বন্দ্ব শুরু হয় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে।

লিথুয়ানিয়ায় সেনা মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি নেদারল্যান্ডস: পূর্ব ইউরোপের দেশ ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান আগ্রাসনের মাঝে লিথুয়ানিয়ায় সেনা মোতায়েন করছে জার্মানি। রোববার লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, লিথুয়ানিয়ায় বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মোতায়েন করবে জার্মানি। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ট্যাঙ্কে সজ্জিত একটি সেনা ব্যাটালিয়ন পাঠাবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরভিডাস আনুসাসকাস বলেছেন, নেদারল্যান্ডস থেকেও আরো অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে। চলতি মাসে লিথুয়ানিয়ায় যে সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র এবং নেদারল্যান্ডসের এই সৈন্য সেই মহড়ার অংশ হিসাবে মোতায়েন করা হচ্ছে না।আনুসাসকাস বলেছেন, এখন পর্যন্ত লিথুয়ানিয়ায় ন্যাটো জোটের প্রায় ৩ হাজার সৈন্য রয়েছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত দেশটিতে বিদেশি সৈন্য সংখ্যা ৪ হাজারে পৌঁছাবে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর লিথুয়ানিয়ার সরকার দেশটিতে অতিরিক্ত সেনা এবং সামরিক সরঞ্জাম বৃদ্ধি করতে ন্যাটোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

অপরদিকে, টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় মারিউপোলের সিটি কাউন্সিল বলেছে, জাপোরিজিয়া অঞ্চলে লড়াই চলছে। অথচ কথা ছিল, মারিউপোল থেকে মানবিক করিডোর ব্যবহার করে বেসামরিক লোকজনকে এই শহরে সরিয়ে নেওয়া হবে। লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার পথ বরাবর ‘অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি’ নিশ্চিত করতে রাশিয়ান পক্ষের সাথে আলোচনা চলছে বলে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মেয়র সেরহি ওরলভ বিবিসিকে বলেছেন, ‘রাশিয়ানরা আমাদের লক্ষ্য করে বোমা বর্ষণ এবং গোলাবারুদ নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। এটি একেবারে পাগলামি।’ তিনি বলেন, মারিউপোলে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার পথজুড়েও যুদ্ধবিরতি দেখা যাচ্ছে না। আমাদের বেসামরিক লোকজন চলে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু গোলাগুলির মুখে তারা পালাতে পারছে না। মারিউপোলের একজন বাসিন্দা যিনি এই নগরীর কেন্দ্রে বসবাস করেন তিনি বিবিসিকে বলেছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শহরে এখনও গোলাগুলির শব্দ অব্যাহত রয়েছে।

৪৪ বছর বয়সী প্রকৌশলী আলেকজান্ডার বলেন, এই মুহূর্তে আমি মারিউপোলে রয়েছি। আমি এখন মারিউপোলের সড়কে রয়েছি। আমি প্রতি তিন থেকে পাঁচ মিনিট অন্তর গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, ‘সবুজ করিডোরটি একেবারে অর্থহীন। আমি এমন লোকজনের গাড়ি দেখতে পাচ্ছি, যারা পালানোর চেষ্টা করেছিল এবং তারা বর্তমানে শহরে ফিরে আসছে।’ গত ৯ দিনের রুশ অভিযানে ইউক্রেন থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্শিতী রাষ্ট্র পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ লাখ ইউক্রেনীয়। এছাড়াও শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে আছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুও। রাশিয়া ও ইউক্রেনের সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য সংলাপ শুরু করেছেন। সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র বেলারুশের উদ্যোগে দেশটির ইউক্রেন সীমান্তবর্তী শহর গোমেলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফা বৈঠক হয় দুই দেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে। তার পর দ্বিতীয় দফা বৈঠক হয় বৃহস্পতিবার। প্রথম বৈঠকে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও দ্বিতীয় দফার বৈঠকে তিনটি পয়েন্টের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অবিরাম গোলাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর এবং গ্রাম থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মানবিক করিডোর চালু। এসবের মধ্যে তৃতীয় পয়েন্ট অর্থাৎ অবিরাম গোলাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর এবং গ্রাম থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মানবিক করিডোর চালুর ব্যাপারে রুশ ও ইউক্রেন প্রতিনিধিদল ঐকমত্যে পৌঁছেছেন বলে বৃহস্পতিবারই জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

বর্তমানে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ, খারকিভ, শেরনিগভ, মারিউপোল ও ভোলনোভাখা শহরে ব্যাপক সংঘাত হচ্ছে রুশ ও ইউক্রেন বাহিনীর সেনা সদস্যদের মধ্যে। এসবের মধ্যে মারিউপোল ও ভোলনোভাখা শহরের অবস্থা সবচেয়ে সঙ্গীন বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সহকারী মিখাইল পোদোলায়াক।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment