News Britant

Thursday, August 11, 2022

রুশ-ইউক্রেনীয় সৈন্যদের মাঝে চলছে তীব্র লড়াই

Listen

কিয়েভকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করতে ঘিরে ফেলছে রুশ সেনারা॥ মসজিদে আশ্রয় নেওয়া তুর্কিদের ওপর রুশ হামলা॥ ইউক্রেনের ৩৪৯১টি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে রাশিয়া॥ শুধু মারিওপোলেই ১৫৮২ বেসামরিক লোক নিহত

#হাবিবুর রহমান, ঢাকা: ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখলের জন্য শনিবার রুশ সামরিক বাহিনী পুরোমাত্রার আক্রমণ শুরু করেছে। কিয়েভের আশপাশের এলাকায় শনিবার রুশ সৈন্যদের সঙ্গে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর মাঝে তীব্র লড়াই চলছে। রুশ সেনাদের গোলাবর্ষণ থেকে বাঁচতে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মারিওপোলের একটি মসজিদে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের ওপর গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। ৮৬ জনের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। আশ্রয় নেওয়া সবাই ছিল তুর্কি নাগরিক। তবে কিয়েভকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করতে ঘিরে ফেলছে রুশ সেনারা। এই পর্যন্ত ইউক্রেনের ৩৪৯১টি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে বলে দাবী করেছে রাশিয়া। রুশ বাহিনীর হামলায় শুধু মারিওপোলেই ১৫৮২ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেন।

জানা গেছে, যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিষ্ফল আলোচনার পর ইউক্রেনে হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভকে ঘিরে ট্যাংক-কামানের গোলাবর্ষণ করতে করতে এগিয়ে আসছে রুশ বাহিনী। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ার ৪০ মাইল দীর্ঘ যে সেনাবহরটি কিয়েভ থেকে ১৫ মাইল দূরে থেমে ছিল তা আরো এগিয়ে এসে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে কিয়েভকে প্রায় ঘিরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট কোম্পানি ম্যাক্সার টেকনোলজিস নতুন কিছু ছবি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমে মোসচুনে বাড়িঘর জ্বলতে দেখা গেছে। ছবিতে রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমে শহর জুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ধরা পড়েছে। সাঁজোয়া যান, ট্যাংক ও কামান নিয়ে কিয়েভের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে রুশ সেনাদের দেখা গেছে। কিয়েভের উত্তরে রুবিয়াঙ্কা শহরের কাছে রুশ সেনাদের দেখা গেছে। উত্তর-পূর্ব দিক থেকে রুশ সেনাদের একটি বহর রাজধানীর দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে।

শনিবার শান্তি আলোচনা স্থগিতের পর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের তিন পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরে প্রথমবারের তীব্র গোলাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। এত দিন পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোতে হামলা হলেও পশ্চিমের শহরে হামলার ঘটনা এটিই প্রথম। গত শুক্রবার ভোরে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লুতৎস্ক ও ইভানো ফ্রাঙ্কিভস্ক এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দিনিপ্রোতে হামলা শুরু করে রুশ বাহিনী। গতকাল শনিবারও এ হামলা অব্যাহত ছিল। গত এক দিনে রুশ সেনারা আরো এগিয়ে এসেছে। সূত্র জানায়, রাজধানীর কিয়েভ এবং তার পশ্চিমে জাইটোমিরে বিমান হামলার সাইরেন বাজতে শোনা গেছে। বাসিন্দাদের বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে সতর্ক করা হয়েছে। কিয়েভের আশপাশে প্রচণ্ড গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গতকাল শনিবার ইউক্রেনের রাজধানীর আশপাশে লড়াই অব্যাহত ছিলো। শহরের প্রশাসন বলেছে বুচা, ইরপিন এবং হোস্টোমেলের পাশাপাশি কিয়েভের আরো উত্তরে ভিশোরোদ জেলাসহ উত্তরের অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। শহরের পূর্বে, ডিনিপার নদীর ওপারে ব্রোভারিতেও তীব্র লড়াই চলছে।

সর্বশেষ ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে আজভ সাগরের তীরবর্তী অবরুদ্ধ বন্দর শহর মারিউপোলের উত্তরের শহর ভলনোভাখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রাশিয়া-সমর্থিত বিদ্রোহীরা। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, রুশপন্থীরা শহরটির দখল নিয়েছে। শহরটি মারিউপোলের উত্তরাঞ্চলীয় প্রবেশপথ হওয়ায় কৌশলগতভাবে এর গুরুত্ব রয়েছে। ইউক্রেনের পার্লামেন্ট সদস্য ইন্না সোভসুন শনিবার টুইটে লিখেছেন, ইউক্রেনে আর কোনো নিরাপদ শহর নেই। তিনি বলেন, ‘দুই সপ্তাহ ধরে আমরা শুধু দিনের বেলায় বড়জোর তিন ঘণ্টা ঘুমাই। সন্তানদের জীবন নিয়ে আমরা আতঙ্কিত। আমরা আত্মসমর্পণ করতে পারি না। আমরা তাদের হাতে দেশ তুলে দিতে পারি না। আমাদের আসলে লড়াই করা ছাড়া উপায় নেই।’ রুশ হামলা জোরদার হওয়ার বিষয়টি ইউক্রেন কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলিয়াক শনিবার এক টুইটে বলেছেন, বড় শহরগুলো আবারও ধ্বংসাত্মক হামলার মুখে পড়েছে।

রুশ বাহিনীকে প্রতিরোধে ইউক্রেনের সেনারাও চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো বলেছেন, রাজধানীর বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ চলে গেছে। রুশ সেনাদের প্রতিরোধে এখন প্রতিটি বাড়ি একেকটি দুর্গে পরিণত হয়েছে। নিজের নিরাপত্তা ইস্যুতে ইউক্রেনকে অসামরিকীকরণ করতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরু করে রুশ বাহিনী। রুশ হামলার কারণে ইতোমধ্যে ১৫ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনে অভিযান চলবে জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এদিকে রুশ সেনাদের গোলাবর্ষণ থেকে বাঁচতে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মারিওপোলের একটি মসজিদে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের ওপর গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। ৮৬ জনের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। আশ্রয় নেওয়া ৮৬ জনের সবাই ছিল তুর্কি নাগরিক। দূতাবাসের বরাত দিয়ে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইউক্রেনে অবস্থিত তুর্কি দূতাবাস জানায়, ওই মসজিদে আশ্রয় নিয়েছি মোট ৮৬ জন তুর্কি নাগরিক। তাদের মধ্যে ৩৪ জন শিশু। গোলাবর্ষণের পর তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক টুইট বার্তায় জানায়, মারিওপোলে সুলতান সুলেমান এবং তার স্ত্রী হুররাম সুলতানের নামে নির্মিত জাঁকজমকপূর্ণ ওই মসজিদটি রুশ সেনাদের গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।  ৪ লাখ মানুষের বসবাস মারিওপোলে। বেশ কয়েকদিন ধরে এ শহর অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সেখানে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে রুশ সেনারা। শহরটিতে এ পর্যন্ত হাজারের বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার হামলার কারণে সেখান থেকে বেসামরিক লোকজন অন্য জায়গায় সরেও যেতে পারছেন না। এরই মধ্যে অবরুদ্ধ এ শহরে রাশিয়ার চালানো ধ্বংসযজ্ঞের ছবি সামনে এসেছে। মারিওপোল দখলে নেওয়ার পর ১২ দিনে রাশিয়ার গোলাবর্ষণে অন্তত ১ হাজার ৫৮২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। সিটি কাউন্সিল গত শুক্রবার একটি অনলাইন বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। তবে দ্য গার্ডিয়ান হতাহতের পরিসংখ্যান যাচাই করতে পারেনি। মারিওপোলে এখন বিদ্যুৎ ও মোবাইলের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন। সেখানকার মানুষরা খাদ্য ও পানির সংকটে রয়েছেন। এর মধ্যে সেখানে একাধিকবার ‘মানবিক করিডর’ চালু করার চেষ্টা করেও ইউক্রেন প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।

অপরদিকে ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৯১টি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি করেছে রাশিয়া। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল শনিবার এই তথ্য জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কোনাশেনকভ। তিনি রুশ বার্তা সংস্থাকে এ খবর জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স। কোনাশেনকভ বলেছেন, রুশ বাহিনী ‘বিস্তৃত ফ্রন্টে’ ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য যাচাই করতে পারেনি। এছাড়াও ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর বেশ কয়েকটি শহর দখলে নিয়েছে রুশ বাহিনী। যুদ্ধে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে ইউক্রেন। দেশটির রাজধানী কিয়েভ ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মারিওপোল চারপাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে রুশ সেনারা। সেখানে ব্যাপক যুদ্ধ চলছে। ৪ লাখ মানুষের বসবাস মারিওপোলে। বেশ কয়েকদিন ধরে এ শহর অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সেখানে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে রুশ সেনারা।

শহরটিতে এ পর্যন্ত হাজারের বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার হামলার কারণে সেখান থেকে বেসামরিক লোকজন অন্য জায়গায় সরেও যেতে পারছেন না। এরই মধ্যে অবরুদ্ধ এ শহরে রাশিয়ার চালানো ধ্বংসযজ্ঞের ছবি সামনে এসেছে। মারিওপোল দখলে নেওয়ার পর ১২ দিনে রাশিয়ার গোলাবর্ষণে অন্তত ১ হাজার ৫৮২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। সিটি কাউন্সিল গত শুক্রবার একটি অনলাইন বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। তবে দ্য গার্ডিয়ান হতাহতের পরিসংখ্যান যাচাই করতে পারেনি।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment