News Britant

Thursday, August 11, 2022

ইউক্রেনে মানবিক পরিস্থিতি বিপর্যয়

Listen

সামরিকঘাঁটিতে রুশ বাহিনীর হামলায় নিহত ৩৫ ও আহত ১৩৪ জন॥ চলছে দফায় দফায় বিস্ফোরণ॥ আজ তৃতীয় দফায় বৈঠকে বসছে ইউক্রেন-রাশিয়া

#হাবিবুর রহমান, ঢাকা: ইউক্রেনের মানবিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি শহরে বিপর্যয় নেমে এসেছে। পূর্ব ইউরোপের এই দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরুর ১৮তম দিনে রোববার একথা জানায় ইউক্রেন। এদিকে পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় লিভভ শহরে সামরিকঘাঁটিতে রুশ বাহিনীর হামলায় নিহত বেড়ে ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৩৪ জন। গতকাল রোববার স্থানীয় সময় ভোরের দিকে এই হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর ম্যাক্সিম কোজিৎস্কি। চলমান যুদ্ধের মধ্যে সোমবার তৃতীয় দফায় বৈঠকে বসতে যাচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা। তবে এবারের বৈঠকটি কোথায় হচ্ছে সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। দেশ দুটির মধ্যে প্রথম বৈঠকটি হয় ইউক্রেন-বেলারুশ সীমান্তে।

তবে রাশিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের প্রধান মিখাইল মিজিনতসেভ বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত ইউক্রেনের মানবিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং বেশ কিছু শহরে তা ইতোমধ্যেই বিপর্যয়কর অবস্থায় পৌঁছেছে।’ অবশ্য পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির মানবিক পরিস্থিতির অবনতির পেছনে রাশিয়ার দোষ দেখছেন না মিখাইল মিজিনতসেভ। ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি শহরের আবাসিক এলাকায় মাইন স্থাপনের মাধ্যমে রাস্তা ও সেতুসহ বহু অবকাঠামো ধ্বংস এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিদ্যুৎ, পানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকটে রাখার জন্য তিনি দেশটির ‘জাতীয়তাবাদীদের’ অভিযুক্ত করেন। মিজিনতসেভ আরো বলেছেন, রুশ সেনাদের হাতে অবরুদ্ধ ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মারিউপোলে ‘জাতীয়তাবাদীরা’ কয়েক হাজার মানুষকে আটকে রাখায় শহরটির মানবিক পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, ‘বিদেশি নাগরিকসহ কয়েক হাজার মানুষকে জোরপূর্বক বন্দি করে রেখেছে জাতীয়তাবাদীরা।’

রাশিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের এই প্রধানের অভিযোগ, ১৬টি দেশের প্রায় ৭ হাজার নাগরিক এবং ৫০টিরও বেশি বিদেশি জাহাজের ক্রুদের জিম্মি করে রেখেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রাশিয়ান সৈন্যরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ইউক্রেনে এই হামলা শুরু করে। একসঙ্গে তিন দিক দিয়ে হওয়া এই হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে বৃষ্টির মতো। সর্বাত্মক হামলা শুরুর পর এক সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির বহু শহর কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ২০ লাখ ইউক্রেনীয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, প্রাণ বাঁচাতে ঘর-বাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হওয়া এসব মানুষের মধ্যে প্রায় ৮ লাখই শিশু।

সূত্র জানায়, পূর্ব ইউক্রেনের মারিউপোল শহর প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। সেখানে তীব্র লড়াইয়ের কারণে শহরের বাইরে থেকে কেউ সেখানে প্রবেশ বা বের হতে পারছেন না। সাহায্য-সহায়তা নিয়ে আসা বিভিন্ন যানবাহনকেও শহরের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে শহরের উপকণ্ঠে মানবিক সহায়তা নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রেড ক্রসের ইন্টারন্যাশনাল কমিটির জেসন স্ট্র্যাজিউসো আল জাজিরাকে বলেন, মারিউপোলে হাজার হাজার পরিবার পানি ছাড়া শোচনীয় অবস্থায় রয়েছেন। তিনি বলেন, এমনকি আমাদের দলও (রেড ক্রস) নদী থেকে পানি সংগ্রহ করছে কিন্তু সবাই সেটা কিভাবে করবে… বিশেষ করে যদি কেউ বয়স্ক হয়। এদিকে তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন। ইউক্রেনের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে স্থানীয় সময় রোববার বিমান হামলার সতর্ক সংকেত পাওয়া গেছে। খারকিভ, চেহেরনিভ, সুমি ও মারিউপোলের মতো শহর ঘিরে রেখেছে রুশ বাহিনী। বোমা হামলার খবরও মিলছে। স্থানীয়রা বলছেন, কিছু সময় পরপর শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ। রাজধানী কিয়েভের কাছে দুপক্ষের ব্যাপক লড়াই চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে, রোববার স্থানীয় সময় ভোরে ইউক্রেইনের লিভভ অঞ্চলে অবস্থিত আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী ও নিরাপত্তা কেন্দ্রে বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে রাশিয়া। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ১৩৪ জন। লিভভের গভর্নর এই তথ্য নিশ্চিত করে। তবে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি লিভভ শহরের ৩০ কিলোমিটার উত্তরপশ্চিমের জেলা ইয়াভোরিভে অবস্থিত। এটি পোল্যান্ডের সীমান্ত থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইউক্রেন জানিয়েছে, বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকরা এই ঘাঁটিতে কাজ করতেন। তবে হামলার সময় সেখানে তারা কেউ ছিলেন কিনা তা স্পষ্ট নয়।  গার্ডিয়ান বলছে, ইয়াভোরিভে এই ঘাঁটিতে গতকাল রোববার দুইটি বড় বিস্ফোরণ দেখা গেছে। ভোর ৫ টা ৪৫ মিনিটে এই ঘাঁটিতে রকেট হামালা শুরু হয়। ম্যাক্সিম কোজিৎস্কি বলেন, ইয়াভোরিভ ঘাঁটিতে রাশিয়ার বাহিনী ৩০টির বেশি ক্রুজ মিসাইল ছুড়েছে। এদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে সাইরেন বাজানো ১৯টি অ্যাম্বুলেন্স ইয়াভোরিভের সামরিক ঘাঁটির দিকে যেতে দেখা গেছে। এছাড়া পরবর্তীতে আরো সাতটি অ্যাম্বুলেন্স ওই ঘাঁটির দিকে যেতে দেখা যায়।

তবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তাসংস্থা ইউএনআইএএন জানিয়েছে, লভিভ শহরে দু’টি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লভিভ এবং ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলে সারা রাত ধরে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়। এছাড়া ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যম কিয়েভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, লভিভে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর মিসাইল হামলা চলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য, বিশেষ করে শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা ও নিরাপত্তা কেন্দ্র (আইপিএসসি) গঠিত হয়েছিল। এখানে বিদেশি সেনারাও প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে।

অপরদিকে, চলমান যুদ্ধের মধ্যে সোমবার তৃতীয় দফায় বৈঠকে বসতে যাচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা। এবারের বৈঠকটি কোথায় হচ্ছে সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। দেশ দুটির মধ্যে প্রথম বৈঠকটি হয় ইউক্রেন-বেলারুশ সীমান্তে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনের ওপর হামলা চালালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। হামলা ঠেকাতে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইউক্রেনও। দুপক্ষের লড়াই গড়ালো ১১তম দিনে। এর আগে যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বের হতে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার প্রতিনিধিদের দুই দফা আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি তারা।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment