News Britant

Thursday, August 11, 2022

বিশ্ব যক্ষা দিবসে নিউজ বৃত্তান্তের হয়ে কলম ধরলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ দেবব্রত রায়

Listen

কোভিড পরিস্থিতি কি অন্তরায় হ’য়ে  দাঁড়াচ্ছে টিবি মুক্ত ভারতের স্বপ্নের?

ডা: দেবব্রত রায়

(সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার, ডিস্ট্রিক্ট টিবি সেন্টার, রায়গঞ্জ সরকারি  মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল)

এই লেখাটি তৈরীর অনেক আগেই আমাদের দেশে কোভিদ ঢেউয়ের সব পর্যায় মিলে  আক্রান্তের সংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছে গেছে। সাম্প্রতিক অতীতে এত অল্প সময়ে মানুষের মধ্যে এমন বিপর্যয়ের হদিস নেই বললেই চলে(স্প্যানিশ ফ্লুর কথা বাদ দিলে)। যদি আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণকাল মোটামুটি দুই বছর ধরে নেওয়া যায় তবে গাণিতিক নিয়মে গড়ে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় কুড়ি হাজারের কাছাকাছি ।এই সংখ্যার মধ্যে উপসর্গহীন এবং উপসর্গ যুক্ত দুই ধরনের মানুষই আছেন।

প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে ভারতে আরো একটি রোগ কিন্তু প্রায় সমভাবে মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। সেই রোগটি ‘যক্ষ্মা’ বা ‘টিবি’। অনেকে বলে থাকেন ‘রাজরোগ’। কোভিদে রোগীর মৃত্যুর হার যেখানে প্রায় ৩ শতাংশের আশেপাশে সেখানে টিবি জনিত কারণে তা ৪%। সুতরাং শতকরা হিসেবে মৃত্যুর ভয়াবহতা টিবির ক্ষেত্রে কোভিদ থেকে খুব একটা স্বস্তিকর জায়গায় নেই  আমরা। কেন না- বিগত কয়েক বছর ধরেই টিবি রোগের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন আমাদের দেশে। প্রতিবছর প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যায় এখানে ১৬৭ জন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন যেখানে সেখানে মারা যাচ্ছেন প্রায় ১৭ জন। পরিসংখ্যণ বলছে কেবলমাত্র ২০১৮ সালে ভারতের টিবি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২৭ লক্ষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সর্ব মোট রোগীর এক-চতুর্থাংশ রোগীই ভারতের।

আবার কোভিডের ক্ষেত্রেও সংখ্যার বিচারে ভারত একেবারে প্রথম সারিতে রয়েছে। লকডাউন নিশ্চিতভাবে দেশ এবং ব্যক্তি  আর্থিক  সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। বন্ধ কল-কারখানা, শ্রমিকদের কর্মহীনতা, পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার চেষ্টা, বন্ধ গণপরিবহন ব্যবস্থা সব মিলিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। একই ধরনের ভাবনার শেষ নেই কিন্তু টিবি নিয়েও। ভারতে ৭০% টিবি রোগীর বয়স ১৫ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে যে সময়টা মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়। প্রতিবছর প্রায় ৩ লক্ষ বাচ্চা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয় কেবলমাত্র পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষের টিভি হওয়ার কারনে এবং আশ্চর্য হলেও সত্যি যে এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও প্রতিবছর প্রায় এক লক্ষ মহিলা পরিবারচ্যূত হচ্ছেন এই কারণে।

এই সমস্ত অনিবার্য কারণে আক্রান্তের পরিবারেল কুড়ি থেকে ত্রিশ শতাংশ পারিবারিক আয় কমে যাচ্ছে এবং গড়ে তিন থেকে চার মাস কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। সুতরাং অসুস্থতাজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে আর্থসামাজিক বৈকল্য যেমন কোভিদের ক্ষেত্রে ঘটে তেমনি টিভি রোগের ক্ষেত্রেও। তবুও কোভিদ নিয়ে এই যে হইচই, ভয়াবহতা এই কারণে যে এত অল্প সময়ে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া, তার সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও ধোঁয়াশা সর্বোপরি রোগ বিস্তার নিয়ে নানা মুনির নানা মত এবং রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ব্যবস্থার  অপ্রতুলতা নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে টিবি যে একটি জীবাণু ঘটিত রোগ এবং হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ড্রপলেট পদ্ধতিতে ছড়ায়  সেকথা আমাদের বহুদিন আগে থেকেই জানা। জামাকাপড় আসবাবপত্র ইত্যাদি যে টিবি রোগ ছড়ানোর মাধ্যম নয় এ নিয়ে কোনো ধোঁয়াশাই নেই। আর রোগ নির্ণয়?

টিবি রোগ নির্ণয় এবং কোভিড নির্ণয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। একটি সাধারন মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা বা  এক্সরে  পরীক্ষা করিয়ে টিবি রোগ নির্ণয় করা যায়। এবং এই মুহূর্তে আমাদের দেশের প্রত্যেকটি ব্লক স্তরে কমবেশি এই পদ্ধতিগুলো উপলব্ধ। অবশ্য কখনো কখনো দরকার হয় CBNAAT বা TRUNAAT। আর  কোভিড পরীক্ষার জন্য RTPCR জেলা স্তরে মেলে। সেই হিসেবে কোভিড রোগ নির্ণয়ের সুযোগ অনেক সংকুচিত। যেসব রোগীর কফে টিবি রোগের জীবাণুর অস্তিত্ব আছে (স্পুটাম  পজিটিভ বা মাইক্রোবায়োলজিক্যালি কনফার্মড  টিবি) চিকিৎসা না হলে তাঁর থেকে বছরে ১০ থেকে ১৫ জন মানুষ সংক্রমিত হতে পারেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা সেই অর্থে ব্যাপক। একজন করোনা সংক্রমিত ব্যক্তি এক ঘন্টায় একশ জনেরও বেশি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন।

অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন উপসর্গহীন কোভিদ আক্রান্তের সংখ্যা উপসর্গযুক্ত আক্রান্তের থেকে অনেক বেশি এবং উপসর্গহীনরা রোগ ছড়ায় অনেক বেশি। অন্যদিকে উপসর্গহীন টিবি রোগী হয় না বললেই চলে।প্রত্যেকটি টিবি আক্রান্তেরই কোন না কোন উপসর্গ থাকে।  সুতরাং তার থেকে সাবধান হওয়া অনেক সহজ। ভারতবর্ষকে টিভি মুক্ত করে গড়ে তুলতে লক্ষ্য সীমা রাখা হয়েছে ২০২৫ সাল। যা আন্তর্জাতিক টার্গেট থেকে  পাঁচ বছর এগিয়ে। সেই দিকে তাকিয়ে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান (এনএসপি ২০১৭ –  ২০২৫) এর মধ্যে বেশ কিছু কার্যকরী পরিকল্পনার কথা ভাবা হয়েছে। সংশোধিত জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বা রিভাইসড ন্যাশনাল টিবি কন্ট্রোল প্রোগ্রামকে(RNTCP) আরো নিবিড় ভাবে কাজে লাগানোর জন্য নাম এবং কাজের ধারা পরিবর্তন করে করা হয়েছে  ‘জাতীয় যক্ষ্মা দূরীকরণ কর্মসূচী বা  ন্যাশনাল টিবি এলিমিনেশন প্রোগ্রাম (NTEP)।

কিন্তু এক বছর ধরে চলতে থাকা করোনা অতিমারির  প্রকোপ এবং প্রভাবে অনেকটাই ধাক্কা খেয়েছে এই পরিকল্পনা। ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতকে টিবি মুক্ত করার প্রচেষ্টা  প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণে বর্তমানে ইনটিগ্রেটেড টিবি কোভিদ অ্যাক্টিভিটি শুরু হয়েছে। বলা হয়েছে প্রত্যেকটি টিবি রোগীর কোভিড পরীক্ষা করাতে হবে এবং প্রত্যেকটি কোভিড রোগীর টিবি রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা করানোর জন্য নির্দেশিকা জারি হয়েছে। কেননা প্রাথমিকভাবে টিবি রোগের লক্ষণ এবং করোনা সংক্রমনের লক্ষণ (যেমন- জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা) একেবারে কাছাকাছি। এই নতুন পরিকল্পনার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। ইমিউনিটি কমে গেলে কোভিড এবং টিবি দুই রোগেরই সম্ভাবনা বাড়ে আবার করোনা সংক্রমন হবার পর সংক্রমিতের ইমিউনিটি কমে যায়। যা  আবার টিবি রোগ সংক্রমনের ক্ষেত্র তৈরী করে।

অন্য দিকে মাস্ক এবং স্যানিটাইজার এর ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা জনসমাগম এড়িয়ে চলার মত করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে টিবি রোগ ছড়াবার প্রবণতা কমবে বলে আশা প্রকাশ করছেন অনেক বিশেষজ্ঞরা। সেই দিক থেকে দেখলে এই করোনা পরিস্থিতি একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে টিবি মুক্ত ভারত গড়ার ক্ষেত্রে।

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment