News Britant

Thursday, December 8, 2022

কুলিক নদীর কাদা পথে : চন্দ্র নারায়ন সাহা ( চতুর্থ পর্ব )

Listen

( খবর টি শোনার জন্য ক্লিক করুন )

কুলিক তীরের পশুপাখি

জলজ বাস্তুতন্ত্রে যে সমস্ত পাখির সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়, কুলিক নদীর তীরেও সেই সমস্ত পাখির ই কুজন শুনতে পাওয়া যায়। নদীর বুকের মাছ থেকে শুরু করে গাছের ফল, মৃত জীব দেহ, এবং ঘর গৃহস্থালির বর্জ্য পদার্থ এই সমস্ত পাখিদের প্রধান খাদ্য। নদীতীরে আমরা যে সকল পাখির হদিশ পেয়েছি, সেগুলি হল শালিক, কাক, ঘুঘু, ফিঙে, বেনে বউ, ডাহুক, টিয়া, বুলবুলি, বাদুড়, পেঁচা, মাছরাঙ্গা, কাঠঠোকরা, কোকিল, পানকৌড়ি, বক, ছোট বক, চড়ুই প্রভৃতি।


এ ছাড়াও স্থানীয় কুলিক পাখিরালয়ে শামুকখোল পাখির অভয়ারণ্য রয়েছে। প্রতিবছর মে মাসে এই পাখিদের দল দূর থেকে এসে আশ্রয় নেয় এবং সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ এরা তাদের ছোট ছানাদের বড় করে এই অভয়ারণ্য ছেড়ে দূর দেশে চলে যায়।
স্থানীয় অঞ্চলে যে সমস্ত প্রাণী উদ্ধার করা হয়, তাদেরকে মূলত এই নদী তীরবর্তী কুলিক অভয়ারণ্য ছেড়ে দেওয়া হয়। তাই এই অভয়ারণ্যে একদিকে যেমন রঙিন প্রজাপতির দল দেখতে পাওয়া যায় তেমনি নানা প্রকার সাপ ,ইঁদুর ,শেয়াল, গিরগিটি ,ফড়িং,বন বিড়াল, বেজি প্রভৃতি এই নদী তীরবর্তী অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়।

কূলিক তীরের ফসল

চারদিনব্যাপী কুলিক নদীর তীর বরাবর সচেতনতামূলক পদযাত্রার প্রতিটি পদে আমরা যে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করেছি, তার ভিত্তিতে স্থানীয় শস্য ক্যালেন্ডারের একটি চিত্র সহজেই তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে ছি।
১. সারাবছর বিভিন্ন রকমের ধান চাষের প্রাধান্য রয়েছে।
২. রয়েছে ভুট্টার মত কম পরিমাণ জলে চাষ হওয়া ফসলের আধিক্য।
৩. পাটের মত অর্থকরী ফসল চাষের প্রাধান্য লক্ষ্য করেছি।
৪. নিম্ন উপত্যকায় শসা কুমড়ো চাল কুমড়ো ঝিঙে পটল ভেন্ডি বেগুন লাউ চিচিঙ্গা বিভিন্ন প্রকার শাক ও আলু চাষের জমি দেখতে পেয়েছি।
৫. শীতকালে আলুর পাশাপাশি সরষে ও গম চাষের প্রাধান্য রয়েছে।

কুলিক তীরের যোগাযোগ

শোনা যায়, প্রাচীনকালে এই কুলিক নদী দিয়ে বড় বড় বাণিজ্যতরী চলাচল করত। পূর্বের সাথে পশ্চিমের যোগাযোগের জন্য এই জলপথ ব্যবহার করা হতো। মুঘল আমলে এই নদীপথে ব্যবসা বাণিজ্য চলত। রায়গঞ্জ শহরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত বন্দর নামক জায়গায় এই বাণিজ্যতরী গুলি থেকে পণ্য ওঠানামা করত। স্থানীয় ধান, পাট থেকে শুরু করে অতিরিক্ত পণ্য নদী পথে চলে যেত দক্ষিণবঙ্গে। অপরদিকে নারকেল, গুড়, সরষের তেল, বস্ত্র, অস্ত্র প্রভৃতি আনা হতো এই বন্দরের মাধ্যমে।
পরবর্তীতে নদীর জলের পরিমাণ কমে আসলে এই নদী পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এখন এই নদীর বুকে বর্ডারের একটি পাকা ব্রিজ বাদ দিয়ে চারটি নদী ব্রিজ নির্মিত হয়েছে। এই ব্রীজ গুলি হল বিন্দোল ব্রিজ, ঠাকুরবাড়ি ব্রিজ, রায়গঞ্জ 12 নম্বর জাতীয় সড়ক পথের উপর ব্রিজ, সুভাসগঞ্জ ব্রিজ প্রভৃতি। বিহার ও বাংলার যোগাযোগের জন্য অপর একটি ব্রিজ এর কাজ শুরু হলেও বর্তমানে এলেনগিয়ার কাছে নির্মীয়মান ব্রিজের কাজ বন্ধ রয়েছে।


পাকা সড়ক ব্রিজ গুলি ছাড়াও রায়গঞ্জের কাছে একটি রেল ব্রিজ রয়েছে। সেই রেল পথ দিয়ে দিল্লি কলকাতা ও শিলিগুড়ি শহর সংযুক্ত রয়েছে। বর্তমানে এই রেলপথ টির ডাবল লাইনের কাজ চলছে।
এই নদীপথের বহু জায়গায় নদীর জল কম থাকলে জল পারাপার করে যাতায়াত চালু রয়েছে। নদীর পাতলা জল স্তর ভেদ করে ট্রাক্টর, মোটরসাইকেল, ভ্যান, সাইকেল, রিক্সা প্রভৃতি নিয়মিতভাবে পারাপার করে। যে সমস্ত অঞ্চলে জলের গভীরতা বেশি, সেখানে পঞ্চায়েত থেকে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। যেমন – আব্দুল ঘাটা, খোকসা, বিশাহার ও বামুনগ্রাম প্রভৃতি।

কুলিক তীরের সংস্কৃতি

আমাদের চলার পথে আমরা প্রত্যক্ষভাবে অঞ্চলটিকে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, অঞ্চলটি প্রধানত হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির তীর্থক্ষেত্র। এই নদীর তীরে একদিকে যেমন বিন্দোল গ্রাম পঞ্চায়েত বরাবর গ্রামে পহেলা বৈশাখ কুমির মেলা বসে, তেমনি এই নদীর তীরেই দুর্গাপুর গ্রামের কাছে এক বিশাল সমাধিক্ষেত্র গড়ে তোলা হয়েছে।

এই নদীর তীরেই কয়েকটি পীরের স্থান চলার পথে আমরা লক্ষ্য করেছি। যা স্থানীয় সংস্কৃতিকেই তুলে ধরে। এই কুলিক এর তিরের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুলি হল-
১. শেরপুর এর বাড়নিতলা শ্মশানে বাউল মেলা।
২. রায়গঞ্জ বন্দর শ্মশানের বিজয়া মেলা।
৩. শিয়াল মনি শ্মশানের কালী মন্দির ও তার মেলা।
৪. চৈত্র মাসের বাসন্তী অষ্টমীতে আব্দুল ঘাটায় অষ্টমী মেলা।

৫. মহিষাগাঁওয়ের পাশেই দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা।
৬. বন্দর প্রাচীন কালী ও দুর্গা মন্দিরের পুজো।
৭. মহালয়ার দিনে নদীর ঘাটে পিতৃ তর্পণ।
৮. ছট পূজা কে কেন্দ্র করে ঘাটে ঘাটে ছট পুজো।
৯. কাঞ্চন পল্লীর বিশাল নাম কীর্তন অনুষ্ঠান।
১০. বিবাহ, অন্নপ্রাশনে বা মৃতদেহ সৎকারের সময় এই নদীর জল ব্যবহৃত হয়।
১১. বিশাহার ও বিন্দলের দুর্গাপুরে নদীতীরে সমাধিক্ষেত্র।
১২. এলেঙ্গা ও বিশাহার এর মাঝে নদীর তীরে পীরের সমাধি। প্রভৃতি।

লক্ষ্য রাখুন পরের পর্বে…

সমগ্র প্রতিবেদনের ঋণস্বীকার শেষ পর্বে।

News Britant
Author: News Britant

1 thought on “কুলিক নদীর কাদা পথে : চন্দ্র নারায়ন সাহা ( চতুর্থ পর্ব )”

  1. আর অষ্টমীর স্নান এর মেলার কথা কোথাও নেই কেন? আব্দুল ঘাটের ওটাই তো ঐতিহ্য।

    Reply

Leave a Comment

%d bloggers like this: