News Britant

Sunday, September 25, 2022

নদী পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা স্বর্গসুন্দরী “ধৌলছিনা”

Listen

( খবর টি শোনার জন্য ক্লিক করুন )

কৌশিক চট্টোপাধ্যায় : “তারপর যে-তে যে-তে যে-তে/এক নদীর সঙ্গে দেখা/পায়ে তার ঘুঙুর বাঁধা/পরনে উড়ু-উড়ু ঢেউয়ের/নীল ঘাগরা।” চটজলদি ক্যামেরাটা অন করে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম। বেশ অনেকটা নীচদিয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলেছে সরয়ূ নদী। দুপাশে পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে নাম না জানা পাহাড়ি গ্রামগুলো। ঝাউবনের ফাঁকদিয়ে ক্যামেরার লেন্স এগিয়ে চলেছে সরয়ূর নীল প্রবাহের দিকে। পাথুরে এবড়ো খেবড়ো পথ বেয়ে সরয়ূর পার্বত্য প্রবাহ। পাথরের আঘাতে আঘাতে ভেঙেচুরে একাকার হয়ে যাচ্ছে তবু্ও নিস্তার নেই এই ক্লান্তিহীন পথ চলার৷ ক্যামেরাটা কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে পরলাম গাড়ির সামনের সিটে। সরয়ূকে বাঁপাশে নিয়ে পাহাড়ি পথে গাড়ি এগিয়ে চললো সামনের দিকে। একটু একটু করে দূরে হারিয়ে যাচ্ছে সরয়ূর নীল প্রবাহ রেখা আর পাহাড়ের ভাঁজে হারিয়ে “যেতে যেতে বুঝিয়ে দিল/আমি অমনি করে আসি / অমনি করে যাই/বুঝিয়ে দিল/ আমি থেকেও নেই / না থেকেও আছি”।

নভেম্বরের গোড়াতেই প্রাক শীতের ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে দুপাশের পাহাড়ি পথে সবুজের সমারোহ। শহুরে দূষণ থেকে সাময়িক মুক্তি। ওয়াইপার দিয়ে ঝাঁপসা কাঁচ পরিস্কার করে সতর্কভাবে গাড়ি এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে। কুমায়ূনে বেড়াতে এসে অনেকবার শুনেছি ‘ধৌলছিনা’র নাম।
ট্যুর লিস্টে নাম না থাকলেও কাটছাট করে একদিন বের করা গেলো ধৌলছিনার জন্য। বিরাট এক বিষধর সাপের কালো গায়ের মতো পিচ কালো রাস্তা ধরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। বিনসরের ঝাউ আর দেওদাড়ুর সাজানো পথ পেরিয়ে আরও প্রায় ২৫ কিলোমিটার। সারাদিনের ক্লান্তি মাখা সূর্যের ঘুমন্ত চোখে তখন রাতের বিছানার নেশা। ঘরে ফেরা ক্লান্ত পাখির ডানায় অন্ধকার নেমে আসছে দূরের পাহাড়ি গ্রাম ধৌলছিনায়। সূর্যের শেষ সোনার আলোয় একটু একটু করে এগিয়ে আসছে দূরের স্বপ্নপুরি।

কৌশানীতে রাত্রিবাসের সময় আবারও শুনলাম কুমায়ূনের পাহাড়ি গ্রাম ধৌলছিনার কথা। বাগেশ্বর থেকে নৈনিতাল যাওয়ার পথে তাই বিনসরের পরিবর্তে ধৌলছিনায় একরাতের সাময়িক বিরতির সিদ্ধান্ত। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম। পাহাড়ের আনাচে কানাচে ছোট ছোট বেশ কয়েকটা পরিবার। ভ্রমনার্থীদের জন্য এর মধ্যেই বেশ কয়েকটি সুন্দর সুন্দর হোমস্টে তৈরি হয়েছে। তুলসী গেস্ট হাউজের মালিক প্রকাশজি’র কাছ থেকেই জানতে পারলাম বিনসরের খুব কাছে হওয়ার কারনে বর্তমানে ভ্রমনার্থীদের কাছে ‘ধৌলছিনা’ ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি শীতের তিনটি মাসে এখানকার গোটা এলাকা পুরোপুরি বরফে ঢেকে যায় আর শীতের শেষে তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়তে থাকলে বরফের চাদর গলিয়ে হেসে ওঠে রঙবেরঙের ফুল ।

প্রকাশজি’র কথা মতো পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে অনায়াসে পৌঁছে গেলাম ধৌলছিনার সবচেয়ে উঁচু জায়গা “#জিরো পয়েন্টে”। বিনসরের ভিউ পয়েন্টের মতই ধৌলছিনার জিরো পয়েন্ট থেকেও ত্রিশূল, নন্দাদেবী, পঞ্চচুল্লি, নন্দাকোটের মতো প্রতিটা শৃঙ্গই পরিস্কার দেখা যায়। কিন্তু, গিয়ে দেখি জমাট মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে স্বর্গের দেবাদিদেবেরা৷ যেন অনন্ত আকাশ জুড়ে একরাশ দম্ভের জাল বিছিয়ে আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে মেঘসেনারা। মনের মধ্যে জমতে থাকা বিষন্নতাকে নিয়েই ফেরার পথ ধরতে যাবো এমন সময়ে এক নামনাজানা পাখির ডাকে চমকে উঠে ক্যামেরা তাক করতেই সেও এক লাফে লুকিয়ে গেলো দূরের ঝাউ আর রডডেন্ড্রনের ঝোপের আড়ালে। গাছের মগডাল থেকে চোখ নামাতেই হঠাৎ যেনো থমকে গেলো সময়। তুলোর মতো মেঘ সরিয়ে উত্তর আকাশে জ্বলজ্বল করছে ত্রিশূল। সূর্যদেবের কঠোর আলোয় ঝলসে উঠছে ত্রিশূলের ফলা। অজানা ভয়ে মেঘের প্রাচীর ছিন্নভিন্ন করে পালিয়ে যাচ্ছে মেঘ সেনারা। চোখের সামনে ক্রমশ খুলে যাচ্ছে স্বর্গের দরজা আর জেগে উঠছে নন্দদেবী, পঞ্চচুল্লি, নন্দাকোটের আকাশচুম্বী বরফ শৃঙ্গ। সোনালী আলোয় থমকে আছে সময়। মনের মধ্যে একেএকে ভেঙে পরছে যত শহুরে ইমারতের জঙ্গল, হারিয়ে যাচ্ছে সব না-পাওয়ার যন্ত্রণা। শুধু অপলক তাকিয়ে থাকা। স্তব্ধতা ছিঁড়ে ঝাউ গাছের ডাল থেকে হঠাৎ ডেকে উঠলো সেই অজানা পাখি। একঝলক আমার দিকে তাকিয়েই সাহসী দুইডানা মেলে দিল দেবভূমির দিকে। হাতের ক্যামেরাটাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে হাত উঠিয়ে বললাম, “গুড বাই – দ্যা বার্ড অফ প্যারাডাইস”

#ধৌলছিনার আশেপাশে :- ধৌলছিনা থেকে পায়ে হেঁটে চলে যেতে পারেন ভিউ পয়েন্টে। আকাশ পরিস্কার থাকলে সেখান থেকেই নন্দাদেবী, ত্রিশূল, নন্দাকোট পঞ্চচুল্লির দেখা পাবেন। পায়ে হেঁটেই পৌঁছে যেতে পারেন আনন্দময়ীর আশ্রমে। ধৌলছিনা থেকে গাড়ি নিয়ে একদিনেই ঘুরে আসতে পারেন #বিনসর রিজার্ভ ফরেস্ট।

কিভাবে যাবেন :- হাওড়া বা এনজেপি থেকে যেকোনো ট্রেনে পৌঁছে যান দিল্লি। সেখান থেকে ট্রেনে #কাঠগোদাম হয়ে গাড়িতে নৈনিতাল। #নৈনিতাল থেকে গাড়িতে #আলমোড়া হয়ে প্রায় ৩ ঘন্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছে যান কুমায়ূনের পাহাড়ি গ্রাম #ধৌলছিনায়। আলমোড়া থেকে ধৌলছিনার দুরত্ব প্রায় ৩৮ কিলোমিটার।

কোথায় থাকবেন :- পর্যটকদের জন্য ধৌলছিনায় বেশ কয়েকটি বেসরকারি রিসোর্ট আছে। তার মধ্যে অন্যতম জয় মা তুলসী গেস্ট হাউজ। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন – ৯৯২৭৭৮১৫৬০, বিনসর ইকো ক্যাম্প – ০৮৯৫৮১-৩৯৪১৪

* লেখাটিতে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার কিছু লাইন ব্যবহার করা হয়েছে

#Dhaulchhina, #Binsar #Kumaoun

#kaushik#Chatterjee

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment