News Britant

Tuesday, September 27, 2022

ডুয়ার্স ঘুরতে নোঙর ফেলুন লাটাগুড়িতে

Listen

( খবর টি শোনার জন্য ক্লিক করুন )

শৌভিক দাস : আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা না করে হুট করে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়ার একটা আলাদা রকম মজা আছে। অনেকটা যেন ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো, যেদিকে হাওয়া নিয়ে যাবে চলে যাবে সেদিক, অজানা কোনো গন্তব্যে। পুজোর পর শারদ বাতাস বাঙালির মনে জাগিয়ে তোলে “বোহেমিয়ান সাইক”। সেই ঘুরুক্কু বাতাস গায়ে লাগতেই ঘন্টা কয়েকের কথোপকথনে দুই বন্ধু বেড়িয়ে পড়লাম পরিবার নিয়ে উত্তরের দিকে। যদিও এবছর উত্তরবঙ্গে নানা কারণে পর্যটকের সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশ কম তাই এই ব্যস্ততা ভরা জীবনে দু’দিনের ভ্রমণ বিরতি এবং কম খরচে ঘুরে আসার জন্য আমাদের চাঁদমারি হল আদি অকৃত্রিম এবং বাঙালির চিরকালীন গন্তব্য ডুয়ার্স।

পাকেচক্রে এবারের ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের আমাদের বেস পয়েন্ট ছিল লাটাগুড়ি। লক্ষ্মীপুজোর পর দিন আমাদের লাটাগুড়ি পৌঁছোতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাতাসে বনস্পতির ঘ্রাণ, আকাশে ভাঙা ভাঙা মেঘের আলপনার মাঝে লুকোচুরি খেলছে সদ্য পূর্ণিমা উত্তীর্ণ চাঁদ। সন্ধ্যার লাটাগুড়ির আঁধারিয়া পথে সেই চাঁদের জ্যোৎস্না যেন আমাদের সঙ্গ দিয়েছিল রাত্রিবাস খুঁজে নিতে। যেহেতু হুট করে বেড়িয়ে পড়া আর তার সাথে অজানার অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করার জন্য আমরা আগে থেকে বা ফোনে কোনো থাকার জায়গা ঠিক করিনি। তাই আমাদের রাত্রির আশ্রয়ের সন্ধান শুরু করলাম গরুমারা জাতীয় উদ্যানের আশপাশ থেকে।(সবাই যা করে থাকেন আর কি) চষে ফেললাম আশপাশের সবকটি হোটেল(আজকাল সবই রিসর্ট) কিন্তু কোনো হোটেলে স্থান সংকুলানের অভাব তো কোনো হোটেলে আমাদের রেস্তের অভাব।

সারাদিন পথ ক্লান্তিতে বাচ্চাকাচ্চাগুলোর পেলব মুখ দেখে তাদের মা’দের মুখ আমাদের অর্থাৎ বাবাদের প্রতি ক্রমশই নীলাভ হয়ে উঠছিল। কিন্তু একদিকে স্থান আর অন্যদিকে আমাদের আর্থিক সংস্থান এই দুয়ের মাঝে পড়ে আমারাও নিরুপায়। রাত্রি হয়ে আসছে দেখে রনে ভঙ্গ দিয়ে গুরুমারা জাতীয় উদ্যানের পাশে মানে কাছাকাছি থাকার আশা ত্যাগ করে চালসার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে নতুন উদ্যমে হোটেলের খোঁজ শুরু করলাম। এদিকে কানের কাছে অবিরত চলা মহিলা কন্ঠে ষষ্ঠীর মন্ত্র হয়ত অলক্ষে আমাদের দুই বন্ধুর চোদ্দপুরুষদের নীচে নামিয়ে এনেছিল। ততক্ষণে আমাদের ভেতরের যাবতীয় সাহিত্য, সৌন্দর্যবোধ ঘুচে গিয়ে মেঘ ভাঙা প্রায় পূর্ণচন্দ্রে এক ক্ষুধিতভাব জেগে উঠেছিল ওয়্যারউল্ফের মতো। তারপর, জানি না আমাদের অপার্থিব পূর্বপুরুষদের মহিমা না আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা কোনটার জোরে আমারা বাটাবাড়ির কাছে সব দিক দিয়ে আমাদের সাযুজ্যপূর্ণ একটা আশ্রয় জুটিয়ে ফেললাম।

“রেইনফরেস্ট রিসর্ট” রাতের অন্ধকারে শারীরিক এবং মানসিক ক্লান্তিতে বাচ্চারা থেকে আমরা পর্যন্ত কাহিল। সে অবস্থায় রেইনফরেস্টে আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে ঢুকে ইহলোকেই পরলোক সুখ অনুভূত হল। বাচ্চাগুলো হাত-পা ছড়িয়ে বসল আর তাদের মায়েদের মুখে ফিরে এলো সেই প্রেমযাপনকালীন হাসি। আহ্ একেই বোধহয় বিবাহিত গুণীজনরা আখ্যায়িত করেছেন স্বর্গসুখ বলে!

প্রশস্ত সুসজ্জিত ঘরের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত শীতাতপের শীতলতা একে একে ধুয়ে দিচ্ছিল আমাদের মানসিক এবং শারীরিক ক্লান্তি। চট জলদি হালকা সান্ধ্যকালীন আহারের পর ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়লাম আশেপাশে একটু হেঁটে চলে দেখার জন্য। ততক্ষণে বাচ্চাগুলো আবার ফুল চার্জড হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে বেড়িয়ে রিসর্টের আলোক সজ্জিত বিস্তৃত বাগানে শুরু করে দিয়েছে তাদের বয়সসুলভ নানান কর্মকাণ্ড।

তাদের মায়েদের গায়ে উঠেছে আধুনিকী পোশাক। ভাল করে দেখে মনেহল তাদের বয়সও বোধহয় খানিক কমে গেছে। পাশ থেকে বন্ধু বলল “একেই বলে স্থান মাহাত্ম্য।” হাফপ্যান্ট আর টি-শার্ট পড়া আমাদের হাত ধরে দুই সুসজ্জিতা রমণী প্রমোদ ভ্রমণে হেঁটে চললেন রিসর্টের গা ঘেঁষে চলে যাওয়া ময়নাগুড়ি ও চালসা সংযোগকারী জাতীয় সড়ক ধরে। একদিকে বাতাবাড়ি ফরেস্ট অন্যদিকে বাটাবাড়ি টি এস্টেট এবং বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠের মাঝে ছেঁড়াছেঁড়া জনবসতি। মনে মনে চিন্তা করছিলাম ‘কোথায় ভেবেছিলাম গরুমারা জঙ্গলের ভেতর হাঁটব সভ্যতার থেকে দূরত্বে, আর কী ভাগ্য এখন হাঁটছি সভ্যতার ধারক বাহক এই জাতীয় সড়ক দিয়ে।’ তবে মহিলাদের আলোচনা কানে যেতেই মনে হল জায়গাটা অতটাও খারাপ নয়, কেননা যাঁদের সচরাচর কোনো কিছুই ভালো বলার অভ্যেস নেই তাঁরা বলছেন “এরপর থেকে লাটাগুড়ি এলে আমরা এখানেই থাকব, আর এই রিসর্টেই উঠবো।” রাতের খাবার দিয়ে দেওয়ার সময় হয়ে যাওয়ায় এবার হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম।

হোটেলে ফিরে রিসেপশনের সামনে পরিচয় হল চ্যাটার্জী দার সাথে যিনি এই রিসর্টের “প্যানাসিয়া” অর্থাৎ ব্যবস্থাপক। কথায় কথায় তিনি জানালেন প্রায় এক বছর আগে শুরু হয়েছে এই রিসর্টির পথ চলা। এরমধ্যেই এখানে এসেছেন অনেক স্বনামধন্য মানুষ। বিখ্যাত ফুটবলার পি.কে বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেন মহম্মদ এরশাদ। এরশাদ সাহেব তো আবার যাওয়ার সময় এখানকার থাকার অভিজ্ঞতা প্রশংসা সূচক বাক্যে লিখে দিয়ে গেছেন খাতায়। চ্যাটার্জী দা সেই লেখা বের করে আমাদের দেখালেন। এই রিসর্টের কয়েকটি জিনিসের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে এক, এখানকার সকলের ব্যবহার বিশেষ করে চ্যাটার্জী দা। দুই, এখানকার পরিচ্ছন্নতা। তিন, খাওয়ার গুণমান এবং খাওয়ার স্বাদ, এদের প্রত্যেকটিই অতুলনীয়।

কার্য সূত্রে বা ঘুরতে গিয়ে অনেক জায়গায় থেকেছি কিন্তু রেইনফরেস্ট রিসর্টের মতো সুখের অভিজ্ঞতা আমার খুব বেশি হয়নি। যাইহোক, ভোকাট্টা ঘুড়ির অভিজ্ঞতা যে খুব একটা সুখকর নয় বিশেষ করে সঙ্গে পরিবার থাকলে, তা হাড়ে হাড়ে আজ টের পাওয়ার পর রাত্রে খাওয়া শেষ করে আমাদের এই বেড়ানোর বাদবাকি দিনগুলোর একটা পরিকল্পনা এবং হোটেল বুকিং-এর জন্য দুই বন্ধুতে ফোনাফুনি শুরু করলাম। কেননা চ্যাটার্জী দার বদান্যতায় আজ রাতের জন্যই এখানে ঠাঁই মিলেছিল কিন্তু কাল থেকে সেটা সম্ভব হবেনা। রুমের প্রি-বুকিং আছে এবং রিসর্ট ফুল প্যাকড।

ভৌগলিক অবস্থানের বিচারে লাটাগুড়ি এমন একটা জায়গা যেখান থেকে অল্প দূরত্বেই মিলবে উত্তরবঙ্গের সব বিশেষত্ব নদী, জঙ্গল আর পাহাড়। তাই উত্তরবঙ্গ ঘুরতে গেলে লাটাগুড়িকে বেস করে ঘোরা যেতেই পারে। আর লাটাগুড়িতে এসে রেইনফরেস্ট রিসর্টের অভিজ্ঞতা অবশ্যই একটা অনন্যতা তৈরী করবে।

এখানে পৌঁছোনোর উপায়? খুবই সোজা, শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি করে সেবক-ডামডিম-মালবাজার হয়ে চালসা মোড় থেকে ডানদিকে ঘুরে গিয়ে মাত্র ৬ কিলোমিটার। আর শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ি-ময়নাগুড়ি হয়ে মৌলানির রাস্তায় মাত্র ৩৪ কিলোমিটার এই রেইনফরেস্ট রিসর্ট যার পোশাকি নাম “রেইনফরেস্ট ডুয়ার্স”। তবে যাই করুন পরিবার নিয়ে আমাদের মতো বিনা বুকিং-এ বেড়িয়ে পড়বেননা যেন। ঘরেবাইরে বিপদে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। প্রয়োজনে যোগাযোগ করা যেতে পারে এখানকার চ্যাটার্জী দা অর্থাৎ গোবিন্দ চ্যাটার্জীর সাথে 9831618897 নম্বরে। ছুটি শেষ হয়ে এলো প্রায়, তাই এখুনি বুকিং করে বেড়িয়ে পড়ুন দুর্গা দুর্গা বলে।

 

 

News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment