News Britant

Wednesday, August 17, 2022

কুলিক নদীর কাদা পথে : চন্দ্র নারায়ন সাহা ( প্রথম পর্ব )

Listen

আমাদের বেঁচে থাকার তাগিদ কুলিক

ভূগোলে আমরা শিখেছিলাম, জল দাঁড়ালেই সেটা পুকুর বা জলাশয় , অন্যদিকে জল গড়ালেই তাকে নদী বলা হয়। সেরকমই নদী আমাদের দেশ ভারত বর্ষে আবহমানকাল থেকেই চলমান। এদেশের বুক চিরে আদি অনন্ত কাল থেকেই বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন নদী বয়ে চলেছে। কোন নদী গুলির উৎপত্তি উচ্চ হিমালয়ের তুষার শৃঙ্গ বা কোন হিমবাহ থেকে। আবার কোন কোন টা সৃষ্টি হয়েছে দেশের মধ্যবর্তী কোন উচ্চভূমি বা মালভূমি থেকে। এই নদীগুলি ছাড়াও আবার এমন কিছু প্রবাহমান জলধারা এদেশের প্রাণ শক্তি রূপে বয়ে চলেছে, যারা স্থানীয়ভাবে কোন বৃহদাকার জলাশয় বা বিল অথবা হ্রদ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এরপর তারা স্রোতস্বিনী রূপে প্রবাহিত হয়ে মিলিত হয়েছে বা পতিত হয়েছে কোন বড় নদী বা কোন জলাশয় বা কোন বৃহৎ আকৃতির হ্রদে। আবার ভারতের দু একটি নদী কচ্ছের রণে গিয়েও বিলীন হয়ে গেছে। তাইতো কবি রবি ঠাকুর লিখেছেন, “ওগো নদী আপন বেগে পাগল পাড়া”


প্রবাহমান জল ধারার গতিপথ সর্বদাই নদী তার নিজের মতো করে তৈরি করে। এই গতিপথ গুলি স্থানীয় ভূ প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করে। একটি নদীর নদীর বুকে অবস্থিত নদী খাত থেকে শুরু করে তার তীরবর্তী খাড়া পাাড় , সবটাই নদীর নিজস্ব সংস্কৃতি তেই গড়ে ওঠে। এই রিভার কালচার পর্যবেক্ষণ করার ধারণা বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। এই রিভার কালচারকে আত্মস্থ করার জন্য স্থানীয় কুলিক নদীর তীর ধরে আমরা নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করি এবং সেগুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

আদি ভাবনা

বন্য প্রান্তরে পথ হারিয়ে যাওয়া পর্যটক বা অভিযাত্রী তার চলার পথে হারিয়ে গেলে, কোন প্রবহমান জলধারার হদিশ খুঁজে বের করেন। সেই পথিক বা পর্যটক বা অভিযাত্রী একবার যদি জলধারার হদিশ খুঁজে পান, তাহলে নিশ্চিতভাবে তিনি তার পথ খুজে পাবেন। কারণ নদী তীরবর্তী পথ ধরে হাঁটলেই এক সময়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে মানব সভ্যতার কাছে। আমরা সকলেই জানি পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীর তীরে। তাই সুপ্রাচীন কাল থেকে নদীপথ ব্যবহারের অভ্যাস রয়েছে মানুষের। কোন একটি নদীর নদী পাড় সহজে বলতে পারে সেই অঞ্চলের ইতিহাস ভূগোল সমাজনীতি লোককথা প্রভৃতি। তাই নদীকে সঠিকভাবে জানলেই কোন নদী তীরবর্তী সংস্কৃতি সহজেই জানা সম্ভব।

উত্তর দিনাজপুর জেলার একমাত্র প্রকৃতিপ্রেমী পাহাড়ি সংস্থা হিমালায়ান মাউন্টেন ইয়ার্স এন্ড ট্রিকস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আমরা কুলিক নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত সমগ্র ভারতে অবস্থিত গতিপথ পায়ে হেঁটে চলার চেষ্টা করেছি এবং সেই সমস্ত তথ্য এই লেখায় প্রকাশ করছি।

এক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা পেয়েছি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর রূপক পাল এবং রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর প্রলয় মন্ডলের কাছে।

কুলিক নদী ও তার কিছু তথ্য

উত্তর দিনাজপুর জেলার মধ্য দিয়ে যে কয়েকটি নদী বয়ে গেছে, তারমধ্যে মহানন্দা , নাগর, কুলিক নদী প্রভৃতি নদী অন্যতম। বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার রায়পুর এর কাছে মরার বিল থেকে কুলিক নদীর সৃষ্টি। এই মরার বিল কে আবার কেউ কেউ ঝুমঝুম বিল বলে অভিহিত করেন। উৎপত্তিস্থলে নদীটি মূলত একটি নালা রূপে তার যাত্রা শুরু করলেও, পরবর্তীতে ওপার বাংলায় আরো কয়েকটি বিলের জল এসে এই কুলিক এর সাথে মিশে যায়। ফলে অপেক্ষাকৃত বৃহদাকার ধারণ করে নদীটি ঠাকুরগঞ্জ ও তার আশেপাশের জলকে নিয়ে তার নদী পথ তৈরি করে আকাবাকা পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার হেমতাবাদ ব্লকের মহিষাগাঁওএ নদীটি প্রথমে ভারতে প্রবেশ করে। ওপারে থেকে যায় বাংলাদেশের গোবিন্দপুর। পরবর্তীতে সেখান থেকেই নদীটি আবার বাংলা দেশে ঢুকে পরে। বর্ডার এলাকায় বেশ কয়েকটা মিয়েন্ডার তৈরি করে নদীটি কেশবপুরের কাছে পাকাপাকিভাবে ভারতে প্রবেশ করে। প্রথমে হেমতাবাদ ব্লক, তারপর রায়গঞ্জ ব্লক এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় সবশেষে নদীটি ইটাহার ব্লকের বিশাহারে নাগর নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। আরও একটু এগিয়ে গোড়া হারে এই কুলিক ও নাগর নদীর মিলিত জলধারা মহানন্দা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।

কুলিক নামকরণ

রায়গঞ্জ মহকুমার দীর্ঘতম এই নদীটির দুই তীরে একসময় প্রচুর পরিমাণে কুলেখাড়া কুলিক কুলিচা নামক শাক উৎপন্ন হত। সেই কুলিক শাকের নাম অনুসারে এই নদীকে কুলিক বলে অভিহিত করার একটা লোককথা প্রচলিত রয়েছে। আবার, কেউ কেউ এই নদীটির অজস্র নদী বাঁক এর কথাও এমন নামকরণের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। নদীটির পুরো গতিপথে একশোরও বেশি নদী বাঁক থাকায় বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাস, এই অঞ্চলে অষ্টনাগের এক নাগ কুলিক এর অবস্থান। তাই তার নামানুসারে এই নদীকে কুলিক নামে অভিহিত করা হয়।

‘কুলিক’ এক নজরে

#দৈর্ঘ্য (ভারতে) -66. 51 কিমি
#দৈর্ঘ্য (বাংলা দেশে)- 66. 76 কিমি
#মোট দৈর্ঘ্য – 133. 27 কিমি
#অববাহিকার আয়তন- 1038. 5 স্কয়ার কিলোমিটার

#ভারতে কুলিক নদী প্রভাবিত কৃষিজমি- 61. 23 হেক্টর
#কুলিক নদীর প্রধান বন্যা- 1987,1997,1999,2017

(তথ্যসূত্র- ডক্টর প্রলয় মন্ডল, ভূগোল বিভাগ, রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়)

  • সমগ্র প্রতিবেদনের ঋণ স্বীকার শেষ পর্বে
  • #কুলিক নদী #kulik river #kulik river history #kulik #কুলিক #কুলিক নদীর কাদা পথে
News Britant
Author: News Britant

Leave a Comment